এখানে হারুন সালেমের মাসি গল্পের প্রশ্ন উত্তর শেয়ার করা হলো। / উচ্চ মাধ্যমিক বাংলা চতুর্থ সেমিস্টার
উচ্চ মাধ্যমিক বাংলা চতুর্থ সেমিস্টার
হারুন সালেমের মাসি (মহাশ্বেতা দেবী) গল্পের প্রশ্ন উত্তর
প্রশ্ন ১. ‘হারুন সালেমের মাসি’ গল্প অবলম্বনে হারা চরিত্রটি বিশ্লেষণ করো।
উত্তর: মহাশ্বেতা দেবীর বাস্তবধর্মী গল্প ‘হারুন সালেমের মাসি’–র অন্যতম কেন্দ্রীয় চরিত্র হলো হারুন বা হারা। গল্পের ঘটনাপ্রবাহের কেন্দ্রেই রয়েছে এই অসহায়, পিতৃমাতৃহীন শিশুটি।
পিতৃমাতৃহীন ও নিঃস্ব শিশু:
হারা ছোটবেলাতেই বাবাকে হারায়। পরে আকস্মিকভাবে মায়ের মৃত্যু তাকে পুরোপুরি অনাথ করে দেয়। জন্ম থেকে দারিদ্র্য ও সংগ্রামই তার সঙ্গী। মায়ের মৃত্যু পরবর্তী সময়ে সে আশ্রয় পায় একমাত্র গৌরবীর কাছে, যিনি তার মা-স্বরূপ হয়ে ওঠেন।
শারীরিকভাবে দুর্বল ও অক্ষম:
হারা বয়সে সাত বছর হলেও শারীরিকভাবে দুর্বল।
জ্বর-জারি লেগেই থাকে, জিভ আড়ষ্ট, ফলে কথা অস্পষ্ট, কখনো কথা আটকে যায়, স্মৃতিশক্তি দুর্বল।
কোনো কথা মনে রাখতে না পারায় সে করে গোনা বা সুতোয় গিঁট দিয়ে জিনিস মনে রাখে—যা তার অসহায়ত্বকে আরও স্পষ্ট করে।
মায়ের আদেশ পালনকারী:
হারার কাছে তার মা-ই ছিল একমাত্র ভরসা। তাই মৃত্যুর পরও সে মায়ের শেষ কথাগুলো আঁকড়ে ধরে বাঁচে।
যেমন—
ঘর থেকে বড়ো মেটে আলু এনে গৌরবীর হাতে তুলে দেওয়া
“মাসির পা ধরে থাকিস”—মায়ের এই নির্দেশ সে সারাজীবন বুকের মধ্যে লালন করে।
মায়ের প্রতি এই বিশ্বাস তার চরিত্রের নিষ্ঠা ও সরলতার পরিচয় বহন করে।
সহযোগী ও পরিণত স্বভাব:
দারিদ্র্য আর অভাবই হরাকে খুব ছোট বয়সে ‘পরিণত’ করে তোলে। লেখিকার ভাষায়—
“উপোস করা অভ্যেস হয়ে গেছে বলে চোখে একটা বিজ্ঞ ভাব।”
গৌরবীর প্রতি কৃতজ্ঞতায় সে নানা ছোটখাটো কাজে সাহায্য করে—
কাঠ কুড়িয়ে আনা
পাতা কুড়িয়ে আনা
কেরোসিন জোগাড় করে লণ্ঠন জ্বালানো
হারা তার সামান্য সামর্থ্য দিয়ে গৌরবীর সংসারে অবদান রাখতে চায়—এটাই তার মানবিক দিক।
অনুভূতিপ্রবণ ও অভিমানী:
শিশুমন অত্যন্ত কোমল। একসময় সমাজের চাপ ও দারিদ্র্যে জর্জরিত গৌরবী রাগের বশে হরাকে দায়ী করে, এমনকি তাকে মারতে উদ্যত হয়। এই অন্যায়ের কারণে হারা অভিমানে ভেঙে পড়ে।
চোখের জল ফেলতে ফেলতে সে নিজের ঘরে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে—এটি তার শিশুসুলভ কোমলতা ও অভিমানী স্বভাবের পরিচয়।
উপসংহার:
সব মিলিয়ে হারা এক অসহায়, অনাথ, শারীরিকভাবে দুর্বল হলেও মায়ের আদেশ পালনকারী, সহযোগী, কৃতজ্ঞ, অভিমানী ও মানবিক চরিত্র।
মহাশ্বেতা দেবী তার মাধ্যমে দারিদ্র্যপীড়িত সমাজে এক শিশুর বেঁচে থাকার সংগ্রাম, নির্ভরতা, আবেগ, এবং ভালোবাসার টানকে হৃদয়স্পর্শীভাবে তুলে ধরেছেন।
প্রশ্ন ২. গৌরবির শুকনো বুকে কিসের যেন ঢেউ লাগে—প্রসঙ্গটি উল্লেখ করো। গৌরবির শুকনো বুকে ঢেউ লাগার কারণ বিশ্লেষণ করো।
উত্তর: মহাশ্বেতা দেবী রচিত ‘হারুন সালেমের মাসি’ গল্পে অনাথ বালক হারা গৌরবীকে জানায় যে—মরার আগে তার মা বলে গেছে, বাড়ির মেটে আলু মাসিকে দিতে এবং মাসির পা ধরে থাকতে। এই কথাটি শুনেই গৌরবির শুকনো বুকে কিসের যেন এক ঢেউ লাগে।
দীর্ঘদিনের দারিদ্র্য, অবহেলা ও একাকীত্বে গৌরবীর জীবন ছিল একেবারে শুষ্ক। তার দুই সন্তান—মেয়ে পুঁটি ও ছেলে নিবারণ—কেউই তাকে দুঃসময় সামলাতে সাহায্য করেনি। পুঁটি চরম দারিদ্র্যের কারণে মায়ের দায়িত্ব নিতে পারেনি, আর নিবারণ বিয়ের পর মায়ের কাছ থেকে দূরে সরে যায়। ফলে মাতৃত্ববোধ, স্নেহ আর আবেগ সব মিলিয়ে গৌরবীর মন এক উত্তপ্ত মরুভূমি হয়ে গিয়েছিল।
এই অবস্থায় হারা যখন মায়ের শেষ ইচ্ছা স্মরণ করে গৌরবীকে ‘মাসি’ বলে ডাকায়, গৌরবী হঠাৎ অনুভব করে-
এই অনাথ শিশুটি তাকে নিঃশর্ত আশ্রয় ও ভালোবাসার মানুষ মনে করছে,
তার মাতৃত্বের শূন্যস্থান পূরণ হচ্ছে,
বহুদিনের কঠোরতা ভেঙে তার হৃদয়ে স্নেহের সঞ্চার হচ্ছে।
তাই হারার মুখের আন্তরিক কথায় গৌরবীর শুষ্ক বুকে আবেগের ঢেউ জেগে ওঠে—যেন তার জীবনের মরুভূমিতে এক ফোঁটা জলের স্পর্শ মেলে।
আরও দেখো: হলুদ পোড়া গল্পের প্রশ্ন উত্তর
প্রশ্ন ৩: ‘হারুন সালেমের মাসি’ গল্প অবলম্বনে গৌরবির চরিত্রটি আলোচনা করো।
উত্তর: মহাশ্বেতা দেবী রচিত ‘হারুন সালেমের মাসি’ গল্পে গৌরবি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। দারিদ্র্য, একাকীত্ব, সংগ্রাম এবং গভীর মানবিকতার যে ছবি লেখিকা এই গল্পে এঁকেছেন, গৌরবি তারই জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।
শারীরিক প্রতিবন্ধী নারী:
গৌরবি জন্ম থেকেই শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী। তার এক পা খোঁড়া, আঙুলগুলো পেছনে মোচড়ানো, ফলে দ্রুত হাঁটতে অসুবিধা হয়। তবুও এই প্রতিবন্ধকতা তাকে জীবনের লড়াই থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারেনি। বরং প্রতিটি পদে কষ্ট নিয়েও সে কঠোর পরিশ্রম করে বেঁচে থাকার পথ খুঁজে নিয়েছে।
পরিশ্রমী ও কর্মঠ:
নিজের দারিদ্র্য বা দুর্বলতার জন্য সে কখনো ভাগ্য বা নিয়তিকে দোষ দেয় না। বরং বিলের ধার, খালপাড় থেকে শাকপাতা, ফলফুল, ঘাস সংগ্রহ করে সংসার চালাত। তার পরিশ্রমই ছিল তার টিকে থাকার একমাত্র ভরসা। এই শ্রমনির্ভরতা তার চরিত্রকে আরও দৃঢ় করে তোলে।
ভাগ্যাহত ও অবহেলিত মা:
গৌরবির সংসারে দুই সন্তান—পুঁটি ও নিবারণ। মেয়ের বিয়েতে অতিরিক্ত খরচ করে তারা আর্থিক বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। গৌরবি ভেবেছিল, “সময়ে পুঁটি আমায় ভাত দেবে,” কিন্তু জামাইয়ের কাজ চলে যাওয়ায় মেয়ের সংসারে তার আর জায়গা হয়নি। অন্যদিকে নিবারণও মাকে আশ্রয় দিতে অস্বীকার করে। ফলে গৌরবির জীবন হয়ে ওঠে নিঃসঙ্গ ও বঞ্চনার।
বুদ্ধিমতী হলেও অসহায় অবস্থান:
হারাকে আশ্রয় দেওয়ার সময় সামাজিক প্রতিকূলতা বাড়তে থাকলে গৌরবি ভাবে, প্রয়োজনে সে ছেলের কাছে গিয়ে সাহায্য চাইবে। তার মনে প্রশ্ন জাগে—“কেঁদে বললে ‘দুটো ভাত দে নিবারণ’, ছেলে কি মা-কে ফেলে দেবে?” এই ভাবনা তার বুদ্ধিমত্তার ইঙ্গিত দেয়, কিন্তু বাস্তবে তার এই প্রত্যাশাও পূরণ হয় না, কারণ নিবারণ তাকে আর গ্রহণ করতে চায় না।
গভীর মাতৃত্ববোধ ও মানবিকতা:
গৌরবির চরিত্রে সবচেয়ে উজ্জ্বল দিক তার মাতৃত্ব। হারার মা মৃত্যুর আগে বলেছিল—“মাসির পা ধরে থাকিস।” এই বাক্যটি গৌরবির হৃদয়ে মাতৃত্বের গভীর সাড়া তোলে। সমাজের বাধা, নিজের দারিদ্র্য ও অনিশ্চয়তা সত্ত্বেও সে হারাকে সন্তানের মতো গ্রহণ করে। এমনকি নিজের ছেলে নিবারণের নিরাপত্তা ছেড়ে, হারাকে নিয়ে সে শহরের অনিশ্চয় ভবিষ্যতের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। এর মাধ্যমে গৌরবি মানবিকতার সর্বোচ্চ পরিচয় দেয়।
উপসংহার:
সব মিলিয়ে গৌরবি একজন শারীরিকভাবে দুর্বল কিন্তু মানসিকভাবে শক্ত, কর্মঠ, ভাগ্যবঞ্চিত, তবু গভীর মানবিক ও মমতাময়ী নারী। তার জীবনসংগ্রাম লেখিকা সমাজের অবহেলিত নারীর দুঃখ, সংগ্রাম এবং মাতৃত্বের শক্তিকে অসাধারণভাবে তুলে ধরেছে।
প্রশ্ন ৪: “কী ভয়ানক প্রতিহিংসা নিবারণের, কিছুই ও ভোলে না।” — নিবারণের প্রতিহিংসার কারণ কী? কীভাবে সে প্রতিহিংসা চরিতার্থ করেছিল?
উত্তর: মহাশ্বেতা দেবী রচিত হারুন সালেমের মাসি গল্প থেকে উক্ত প্রশ্নটি গৃহীত।
নিবারণের প্রতিহিংসার কারণ:
গল্পে দেখা যায়, গৌরবির মেয়ে পুঁটির বিয়ের সময়ে গৌরবি ও তার স্বামী ঘর বানানোর টাকার একটি বড় অংশ খরচ করে জামাইকে ঘড়ি, সাইকেল ও টর্চ কিনে দেয়। তখন ছোট নিবারণ বিষয়টি ভালভাবে নিতে পারেনি।
সাইকেল দেখে ঈর্ষায় ও ক্ষোভে ফেটে পড়ে সে বাবাকে বলে—একজন সন্তানকে বঞ্চিত করে আরেকজনকে সব দেওয়া ঠিক নয়। কিন্তু তার বাবা মায়ের কাছে সে সদর্থক উত্তর পায়নি।
বরং গৌরবি তাকে তিরস্কার করে বলেছিল—“সময়ে পুঁটি-ই তোকে ভাত দেবে।”
এই কথাটিই নিবারণের মনে গভীর ক্ষোভ ও প্রতিহিংসার জন্ম দেয়। সে মনে মনে স্থির করে—সময় হলে সে তার মাকে শিক্ষা দেবে। এটাই ছিল তার প্রতিহিংসার মূল কারণ।
নিবারণের প্রতিহিংসা চরিতার্থ হওয়া:
সময়ের সাথে সাথে নিবারণ নিজের চেষ্টায় ঘর তোলে, মেঝে পাকা করায় এবং নিজের সংসার তৈরি করে।
গৌরবি যখন অসহায় হয়ে ছেলে নিবারণের কাছে আশ্রয় চাইতে যায়, নিবারণ তখন—
তাকে ঘরে তোলে না,
মাকে নিজের সংসারে জায়গা দিতে অস্বীকার করে,
কিছু মাস পাঁচ টাকা করে দিলেও পরে সেটাও বন্ধ করে দেয়।
মায়ের সেই অসহায়ের মুহূর্তেও নিবারণ তার পুরোনো ক্ষোভ ভুলতে পারে না।
ফলে গৌরবি উপলব্ধি করে—
“কী ভয়ানক প্রতিহিংসা নিবারণের, কিছুই ও ভোলে না।”
এভাবেই নিবারণ তার বহুদিনের প্রতিহিংসা বাস্তবে প্রয়োগ করেছিল।
আরও দেখো: Questions Answers from Green House Effect Poem
প্রশ্ন ৫: ‘মনে করেছে কাঙালের আস্পর্ধা’ কারা এ কথা মনে করেছে এবং কার আস্পর্ধার কথা বলা হয়েছে? কোন কাজকে কেন ‘কাঙালের আস্পর্ধা’ মনে করা হয়েছে তা আলোচনা করো।
উত্তর: মহাশ্বেতা দেবীর লেখা ‘হারুন সালেমের মাসি’ গল্প থেকে উক্ত অংশটি নেওয়া হয়েছে। এখানে ‘কাঙালের আস্পর্ধা’ কথাটি মনে করেছিল হারাদের সমাজের মানুষ ও প্রতিবেশীরা। তারা হারার বাবার আচরণকেই ‘আস্পর্ধা’ বলে মনে করেছিল।
হারার বাবা ছিলেন একজন নামকরা ঘরামি। দারিদ্র্যের মধ্যেও তিনি নিজের পরিশ্রম দিয়ে পরিবারের জন্য একটি মজবুত ও কিছুটা উঁচু ঘর বানিয়েছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন—পরিবার যেন নিরাপদে থাকে এবং একটু ভালোভাবে বাঁচতে পারে। কিন্তু সমাজের মানুষ তা ভালো চোখে দেখেনি। তাদের ধারণা ছিল—একজন গরিব ঘরামি, যার সংসারে অনটন চলছে, সে আবার বড়লোক পালবাবুদের চেয়েও উঁচু ঘর তোলার সাহস দেখাচ্ছে! গৌরবীর মন্তব্য—“তোমার ছেলে-বিবির ভিখিরির দশা, তুমি সামান্য ঘরামি, তুমি পালবাবুদের চেয়ে উঁচু ঘর তোল কেন?”—এই সমাজচিন্তারই পরিচয়।
হারার বাবার মৃত্যুর পর প্রতিবেশীরা ঘরের দিকে তাকিয়ে থুতু ফেলে বলেছিল—“ওঃ, ঘর তুলেছিল যেন কোঠাবাড়ি!” অর্থাৎ, গরিব হয়েও ভালো ঘর বানানোর স্বপ্ন দেখাকে তারা ঔদ্ধত্য বলে ভেবেছিল।
এই কারণেই হারার বাবার ঘর তোলার স্বাভাবিক, স্বপ্নময় কাজটিকেই সমাজের লোকেরা অবিবেচক দম্ভ হিসেবে দেখে ‘কাঙালের আস্পর্ধা’ বলে অভিহিত করেছিল।
উচ্চ মাধ্যমিক বাংলা চতুর্থ সেমিস্টার
হারুন সালেমের মাসি গল্পের প্রশ্ন উত্তর
প্রশ্ন ৬: “ঈশ্বরের জিনিস তো! শাকে–পাতায় দোষ নেই।” শাকপাতাকে কেন ‘ঈশ্বরের জিনিস’ বলা হয়েছে? এসব জিনিস দোষমুক্ত কেন?
উত্তর: মহাশ্বেতা দেবীর লেখা ‘হারুন সালেমের মাসি’ গল্পে গৌরবি শাকপাতাকে ‘ঈশ্বরের জিনিস’ বলে মনে করে। কারণ—এই শাকপাতাগুলো মানুষের চাষ করা নয়, কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তিও নয়; প্রকৃতির মধ্যে আপনাআপনি গজিয়ে ওঠে। প্রকৃতির দানকে সে ঈশ্বরের দান বলেই বিশ্বাস করে। গ্রাম্য, সাদাসিধে, দীনদুঃখী এক বিধবা নারী হিসেবে তার ধর্মবিশ্বাস ও সরল মানসিকতা থেকেই এই ধারণা জন্মায়।
গৌরবি ও আয়েছা বিবি বিলের ধারে বা খালের পাশে জন্মানো থানকুনি পাতা, ঢেঁকিশাক, দূর্বাঘাস, বেলপাতা, যজ্ঞডুমুরের ডাল বা জলাশয়ের গুগলি সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করত। এরা কারও বাড়ির নয়, কেউ এগুলো চাষ করে না; তাই এগুলোকে গৌরবি ঈশ্বরসৃষ্ট, দোষমুক্ত জিনিস মনে করত।
গৌরবির ধর্মীয় ভাবনা অনুযায়ী, যেহেতু এই শাকপাতা প্রকৃতির নিজের সৃষ্টি, তাই এগুলোর উপর ‘বিধর্মীর স্পর্শদোষ’ বা জাতিগত অপবিত্রতার ধারণা প্রযোজ্য নয়। সে মনে করত—
ঈশ্বরের সৃষ্টি জিনিসে মানুষের স্পর্শদোষ লাগে না।
এই বিশ্বাস থেকেই তার বক্তব্য—“শাকে–পাতায় দোষ নেই।”
প্রশ্ন ৭: “হারার কথা শুনে গৌরবি অবাক হয়ে গেল।” — হারার কোন্ কথা শুনে গৌরবি অবাক হয়ে গেল? অবাক হওয়ার কারণ কী?
উত্তর: মহাশ্বেতা দেবীর ‘হারুন সালেমের মাসি’ গল্পে এক সকালে হারা গৌরবির উঠোনে এসে তোতলা জিভে বলেছিল—
“মা ললে না মাসি! ডেকে ডেকে দেখলাম মা রা দেয় না।”
অর্থাৎ অনেক ডাকাডাকির পরও তার মা আয়েছা বিবির কোনো সাড়া নেই—এই কথাই শুনে গৌরবি অবাক হয়ে গিয়েছিল।
আয়েছা বিবি ছিল গৌরবির বহু দিনের সহচরী। দুঃখ-দারিদ্র্যে জর্জরিত দুই বিধবা নারীর মধ্যে গড়ে উঠেছিল আন্তরিক বন্ধুত্ব। তারা প্রতিদিন একসঙ্গে শাকপাতা ও গুগলি সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করত, সুখ-দুঃখ ভাগ করে নিত। যদিও গৌরবি জানত আয়েছার প্রতিদিন রাতে জ্বর আসে, তবুও এত ভোরে তার না জাগা বা কোনো শব্দ না করা—এটা গৌরবির কল্পনার বাইরে ছিল।
তাই হঠাৎ হারার মুখে মায়ের অচেতন হয়ে থাকার সংবাদ শুনে গৌরবি বিস্মিত এবং বিস্ময়ের সঙ্গে আতঙ্কিতও হয়ে যায়।
প্রশ্ন ৮: ‘হারুন সালেমের মাসি’ গল্পে সমাজের যে চিত্র ফুটে উঠেছে তার পরিচয় দাও।
উত্তর: মহাশ্বেতা দেবীর ‘হারুন সালেমের মাসি’ গল্পে বাংলার গ্রামীণ সমাজের নিম্নবিত্ত মানুষের কঠিন জীবনসংগ্রাম, দুঃখ-দারিদ্র্য, সামাজিক অবহেলা এবং মানবিকতার সংকট অত্যন্ত বাস্তবভাবে ফুটে উঠেছে। গল্পটি গ্রামবাংলার সেই সমাজকে প্রতিফলিত করে যেখানে দারিদ্র্য মানুষের স্বপ্ন, ইচ্ছে ও সম্পর্ক—সবকিছুকে গ্রাস করে নেয়।
স্বামীর মৃত্যুর পর গৌরবীর জীবনে যে দুঃসহ লড়াই শুরু হয়, তা গ্রামের বহু বিধবা নারীর ভাগ্যের প্রতিচ্ছবি। ছেলে নিবারণ প্রতিহিংসার কারণে মাকে আশ্রয় বা ভাত দিতে রাজি হয়নি—এ দৃশ্য পারিবারিক অবক্ষয় ও মানবিকতার মৃত্যু নির্দেশ করে। নিম্নবিত্ত মানুষের জীবিকার সংগ্রাম, অনাহার, অপমান—সবই গৌরবীর জীবনে প্রতিফলিত।
এই সমাজে জাতপাত ও ধর্মীয় সংস্কারের অত্যাচার প্রবল। হারার মা আয়েছা মুসলমান হওয়ায় সমাজ তাকে একঘরে করে রেখেছে, এমনকি অনাথ হাড়াকে অমানুষিক চোখে দেখে। হারার প্রতি সামান্য সহানুভূতিও তাদের নেই। গৌরবী ধর্মীয় অনুশাসনের ঊর্ধ্বে উঠে মানবিকতার মূল্য রক্ষা করতে চাইলেও সমাজের নিষ্ঠুরতা তাকে প্রতিনিয়ত আঘাত করে।
শেষ পর্যন্ত সমাজের এই রক্তচক্ষু, অন্ধ সংস্কার, ধর্মীয় বিদ্বেষ ও অবহেলাকে এড়িয়ে গৌরবী হাড়াকে নিয়ে অন্যত্র পালিয়ে যায়—এক মানবিক, মুক্ত সমাজের খোঁজে। এই যাত্রাই সমাজের নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং মানবিকতার জয়গান বয়ে আনে।
এভাবে গল্পে গ্রামীণ মানুষের দুঃখ-দারিদ্র্য, পরিবার-সংকট, জাতপাত, ধর্মীয় সংকীর্ণতা এবং তার মাঝেও মানবতার আলো—সব মিলিয়ে একটি বাস্তবসম্মত সমাজচিত্র উপস্থাপিত হয়েছে।
প্রশ্ন ৯: “বড়ো দুঃখ হল গৌরবীর।” — গৌরবীর দুঃখ হল কেন?
উত্তর: মহাশ্বেতা দেবীর ‘হারুন সালেমের মাসি’ গল্পে গৌরবী এক অসহায়, দুঃখিনী, নিম্নবিত্ত নারী। স্বামীর মৃত্যুর পর ছেলে নিবারণের প্রতিহিংসাপরায়ণ আচরণের কারণে সে বাড়ি-ভাত—কোনো আশ্রয়ই পায়নি। মেয়ের কাছেও আশ্রয় না পেয়ে সে একাকী জীবনযুদ্ধে টিকে থাকার পথ খুঁজছিল। ঠিক তখনই হারার মা তার জীবনে একমাত্র সহায়ক হয়ে উঠেছিল।
হারার মায়ের সঙ্গে গৌরবীর সম্পর্ক ছিল বন্ধুত্বের চেয়েও গভীর। দুজনে একসঙ্গে শাকপাতা, গুগলি, যজ্ঞডুমুরের ডাল সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করত। হারার মায়ের সহযোগিতায় গৌরবী অন্তত একবেলা ভাত জোগাড় করতে পারত। তার নিঃসঙ্গ জীবনটাও কিছুটা আলো পায় এই সহমর্মী নারীর কারণে।
কিন্তু হঠাৎ এক সকালে হারার মা মারা যায়। জীবনের একমাত্র সঙ্গী, একমাত্র ভরসার মানুষকে হারিয়ে গৌরবীর মনে ভয়, শূন্যতা ও অসহায়তার জেতু নেমে আসে। এখন আবার তাকে একা জীবনসংগ্রামের কঠিন পথে নামতে হবে—এই ভাবনাতেই তার “বড়ো দুঃখ” হয়।
সুতরাং, হারার মায়ের মৃত্যু এবং তার ফলে গৌরবীর জীবনে নেমে আসা একাকীত্ব, ভয় ও অনিশ্চয়তাই ছিল গৌরবীর দুঃখের মূল কারণ।
প্রশ্ন ১০: “অসম্ভব দুশ্চিন্তা হল গৌরবীর।” – কাকে নিয়ে এই দুশ্চিন্তা? দুশ্চিন্তার কারণ ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: গৌরবী মহাশ্বেতা দেবীর ‘হারুন সালেমের মাসি’ গল্পের মুখ চরিত্র। তার দুশ্চিন্তা মূলত ছোট্ট হারার জন্য।
সদ্য মাতৃবিয়োগ হওয়া হারা নিঃসঙ্গ ও অসহায় অবস্থায় গৌরবীর কাছে আসে নিরাপদ আশ্রয়ের আশায়। হারা গৌরবীকে মাসি বলে ডাকে, কারণ তার মা মারা যাওয়ার আগে তাকে বলেছিল, “মাসির পা ধরে পড়ে থাকিস।” কিন্তু গৌরবীর কাছে পর্যাপ্ত অন্ন বা আশ্রয় নেই। এছাড়া হারা মুসলমান, আর গৌরবী হিন্দু; সমাজের সংকীর্ণ মানসিকতা এই দুই ধর্মের শিশুকে একসাথে রাখার অনুমতি দেয় না। একদিকে হারার প্রতি গৌরবীর প্রবল স্নেহ ও মাতৃত্ববোধ, অন্যদিকে সমাজের অমানবিক রীতিনীতি এবং নিজের সীমাবদ্ধতা—এই দ্বন্দ্বের কারণে তার দুশ্চিন্তা অসীম হয়ে ওঠে। গৌরবী হারাকে নিরাপদ রাখার জন্য কি করবে বা কীভাবে রাখবে তা ঠিকমতো সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না।