প্রশ্ন: বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলনে নারী সমাজ কিভাবে অংশগ্রহণ করেছিল? তাদের আন্দোলনের সীমাবদ্ধতা কি? (প্রশ্ন মান ৮, মাধ্যমিক ২০১৯)
ভূমিকা:
১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে ভারতের তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড কার্জন প্রশাসনিক সুবিধার অজুহাতে বাংলা প্রদেশকে দুই ভাগে ভাগ করেন—পূর্ববঙ্গ ও পশ্চিমবঙ্গ। কিন্তু এর প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল বঙ্গীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে দুর্বল করা। বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্ত ঘোষণার পর সমগ্র বাংলায় তীব্র প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। এই আন্দোলনে পুরুষদের পাশাপাশি বাংলার নারীরাও ঘরের গণ্ডি পেরিয়ে দেশমাতার জন্য রাস্তায় নামে। তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল ভারতীয় জাতীয় আন্দোলনের ইতিহাসে এক নব অধ্যায়ের সূচনা।
নারীদের ভূমিকা:
১. রাখীবন্ধন ও অরন্ধন দিবস পালন:
১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হওয়ার দিনটি প্রতিবাদ দিবস হিসেবে পালিত হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আহ্বানে হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের প্রতীক হিসেবে ‘রাখীবন্ধন’ উৎসব পালিত হয়। নারী সমাজ এতে উৎসাহভরে অংশ নেয়। একই দিন রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদীর উদ্যোগে পালিত হয় ‘অরন্ধন দিবস’। ওই দিন নারীরা রান্না না করে উপবাস থেকে প্রতিবাদ জানান।
২. বিদেশি দ্রব্য বর্জন:
নারীরা বিদেশি কাপড়, অলংকার, চুড়ি, বিলাতি লবণ, মসলা, এমনকি ওষুধ পর্যন্ত ব্যবহার বন্ধ করেন। তারা স্বদেশি দ্রব্য ব্যবহার শুরু করেন ও স্বদেশি শিল্পের প্রসারে ভূমিকা নেন। অনেক নারী বিদেশি দোকানের সামনে গিয়ে বয়কট আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন।
৩. স্বদেশি দ্রব্যের প্রচার ও উৎপাদন:
স্বর্ণকুমারী দেবী ‘সখী সমিতি’ এবং সরলাদেবী চৌধুরানী ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ প্রতিষ্ঠা করেন, যাতে নারীরা দেশীয় দ্রব্য তৈরি ও বিক্রি করে আত্মনির্ভর হতে পারে। নারীদের হাতে তৈরি কাপড়, সূচিশিল্প, গৃহস্থালির দ্রব্য জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
৪. নেতৃত্ব ও সংগঠন গঠন:
সরলাদেবী চৌধুরানী, অবলা বসু, হেমাঙ্গিনী দাস, লীলাবতী মিত্র, কুমুদিনী বসু, সুবালা আচার্য, নির্মলা সরকার প্রমুখ নারী এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। তাঁরা নারীসমাজকে একত্র করে জাতীয় চেতনা জাগিয়ে তোলেন। সরলাদেবী ‘বীরব্রত’ ও ‘প্রতাপাদিত্য উৎসব’ পালন শুরু করেন, যা বাঙালিদের আত্মসম্মানবোধ জাগাতে সাহায্য করে।
৫. পত্রপত্রিকার মাধ্যমে আন্দোলনের প্রসার:
বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলনের সময়ে বহু নারীসম্পাদিত পত্রিকা আন্দোলনের ভাবধারাকে জনগণের কাছে পৌঁছে দেয়। সরলাদেবী চৌধুরানীর সম্পাদিত ‘ভারতী’, সরযুবালা দণ্ড সম্পাদিত ‘ভারত মহিলা’, ‘বামাবোধিনী পত্রিকা’ ও ‘অন্তঃপুর’ পত্রিকা স্বদেশি আন্দোলনের আদর্শ প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এসব পত্রিকার মাধ্যমে নারীরা রাজনীতি ও জাতীয়তাবাদের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হন।
৬. বিপ্লবীদের সহায়তা:
নারীরা বিপ্লবীদের আশ্রয় দেন, সংবাদ ও অস্ত্র পরিবহন করেন এবং আন্দোলনের তহবিল সংগ্রহ করেন। মুর্শিদাবাদের গিরিজাসুন্দরী দেবী, ঢাকার ব্রহ্মময়ী সেন, খুলনার লাবণ্যপ্রভা দত্ত, বীরভূমের দু’কড়িবালা দেবী, বরিশালের সরোজিনী দেবী প্রমুখ নারী এই কাজে বিশেষ অবদান রাখেন।
৭. অর্থসংগ্রহ ও দান কর্মসূচি:
‘মায়ের কৌটা’ নামে একটি উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রতিটি গৃহিণী ঘরে একটি কৌটা রাখতেন, যাতে প্রতিদিন চাল বা অর্থ সংরক্ষণ করা হতো আন্দোলনের প্রয়োজনে। যে নারী বেশি দান করতেন, তাঁকে ‘কল্যাণী’ বা ‘লক্ষ্মী’ উপাধিতে ভূষিত করা হতো।
৮. জাতীয় চেতনা ও সাংস্কৃতিক জাগরণ:
নারীরা বীরাষ্টমী ব্রত, বঙ্গলক্ষ্মী পূজা প্রভৃতি উৎসবের মাধ্যমে দেশপ্রেম জাগিয়ে তোলেন। দেবী লক্ষ্মীকে দেশমাতার প্রতীক হিসেবে প্রচার করে তাঁরা বলেন, “বঙ্গমাতা বঞ্চিত হয়েছেন, তাঁকে ফিরিয়ে আনতে হবে।” এর ফলে সাধারণ নারীদের মনেও দেশপ্রেম ও জাতীয় চেতনা জাগ্রত হয়।
সীমাবদ্ধতা:
যদিও নারীরা বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলনে অসাধারণ ভূমিকা পালন করেন, তবুও তাদের আন্দোলনের কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল—
১. আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী নারীদের অধিকাংশই ছিলেন উচ্চবিত্ত ও শিক্ষিত হিন্দু সমাজের; কৃষক ও মুসলিম পরিবারের মেয়েরা এতে অংশ নেয়নি।
২. আন্দোলন প্রধানত শহরকেন্দ্রিক ছিল; গ্রামীণ নারীদের অংশগ্রহণ ছিল সীমিত।
৩. নারীদের আন্দোলন সামাজিক মুক্তির দাবি তোলেনি; এটি ছিল জাতীয়তাবাদী পুরুষ নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের অংশ।
৪. আন্দোলনের স্থায়িত্ব কম হওয়ায় নারীদের রাজনৈতিক সংগঠন শক্তিশালী রূপ নিতে পারেনি।
উপসংহার:
বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে নারীদের অংশগ্রহণ ছিল ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক ঐতিহাসিক অধ্যায়। যদিও সব শ্রেণির নারী এই আন্দোলনে যোগ দিতে পারেননি, তবুও এই আন্দোলনের মাধ্যমে নারীসমাজ রাজনীতি ও জাতীয় জীবনের মূল ধারায় প্রবেশ করে। বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলন নারীদের মধ্যে দেশপ্রেম, আত্মশক্তি ও আত্মনির্ভরতার বোধ সৃষ্টি করে, যা পরবর্তী কালে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার ভিত্তি স্থাপন করে।
প্রশ্ন: বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে নারীদের অংশগ্রহণের ধরন কেমন ছিল? বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে নারীদের অংশগ্রহণের দুটি বৈশিষ্ট্য লেখো।
উত্তর:
বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলনে নারীদের অংশগ্রহণের ধরন:
১. নারীরা বিদেশি দ্রব্য যেমন কাপড়, চুড়ি, লবণ, মসলা ইত্যাদি বর্জন করে স্বদেশি দ্রব্য ব্যবহার করতে শুরু করেন।
২. তাঁরা রাখীবন্ধন ও অরন্ধন দিবস পালনের মাধ্যমে ঐক্য ও প্রতিবাদের প্রকাশ করেন।
৩. স্বদেশি দ্রব্য উৎপাদন ও প্রচারে সক্রিয় ভূমিকা নেন — যেমন সরলাদেবী চৌধুরানীর ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ ও স্বর্ণকুমারী দেবীর ‘সখী সমিতি’।
৪. নারীসম্পাদিত পত্রিকা যেমন ‘ভারতী’, ‘ভারতমহিলা’, ‘অন্তঃপুর’ প্রভৃতির মাধ্যমে আন্দোলনের ভাবধারা ছড়িয়ে দেন।
৫. বিপ্লবীদের আশ্রয়দান, সংবাদ ও অস্ত্র সরবরাহ, অর্থসংগ্রহ প্রভৃতি গোপন কাজে অংশ নেন।
৬. বীরাষ্টমী ব্রত ও বঙ্গলক্ষ্মী পূজার মাধ্যমে দেশপ্রেম জাগিয়ে তোলেন।
নারীদের অংশগ্রহণের দুটি প্রধান বৈশিষ্ট্য:
(i) আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী নারীদের অধিকাংশই ছিলেন উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত হিন্দু পরিবারের শিক্ষিত মহিলা; সাধারণ গ্রামীণ বা মুসলিম নারীদের অংশগ্রহণ ছিল না।
(ii) তাঁদের অংশগ্রহণ মূলত স্বদেশি দ্রব্য প্রচার, বিদেশি দ্রব্য বর্জন, অর্থসংগ্রহ ও বিপ্লবীদের গোপন সহায়তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।
আরও দেখো: Class XI English 2nd Semester My Last Duchess Bengali Meaning