এখানে প্রার্থনা (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর) কবিতার প্রশ্ন উত্তর শেয়ার করা হলো। / উচ্চ মাধ্যমিক বাংলা চতুর্থ সেমিস্টার
উচ্চ মাধ্যমিক বাংলা চতুর্থ সেমিস্টার
প্রার্থনা (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর) কবিতার প্রশ্ন উত্তর
প্রশ্ন ১: ‘প্রার্থনা’ কবিতায় কবি কীভাবে ভারতবর্ষকে স্বর্গে জাগরিত করার কথা বলেছেন, তা নিজের ভাষায় আলোচনা করো।
উত্তর: বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘প্রার্থনা’ কবিতায় ভারতের জন্য একটি মহান আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছেন। তিনি এমন এক দেশের স্বপ্ন দেখেছেন, যেখানে মানুষের চিত্ত হবে ভয়শূন্য এবং মাথা থাকবে উঁচু। মানুষ মুক্তভাবে জ্ঞান অর্জন করবে, কোনো সংকীর্ণতার গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকবে না।
কবি চান ভারতবাসী যেন কেবল নিজের ঘর বা ছোট্ট প্রাঙ্গণে সীমাবদ্ধ না থেকে সমগ্র বিশ্বকে আপন করে দেখে। মানুষের বাক্য আসবে হৃদয়ের গভীরতা থেকে, সত্য ও আন্তরিকতায় ভরা থাকবে। দেশের কর্মধারা হবে অবাধ, যা দেশ থেকে দেশে ছড়িয়ে দেবে উন্নতির বার্তা।
সমাজে কুসংস্কার, তুচ্ছ আচারের বোঝা বা সংকীর্ণতার মরুভূমি যেন মানুষের যুক্তি, বিবেক ও চিন্তার পথ বন্ধ না করে। মানুষের শক্তি বিভক্ত না হয়ে ঐক্যবদ্ধ হোক, দেশের উন্নতির পথে কাজ করুক।
সবশেষে কবি ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেন—
“নিজ হস্তে নির্দয় আঘাত করি, পিতঃ, ভারতেরে সেই স্বর্গে করো জাগরিত।”
অর্থাৎ ঈশ্বর যেন ভারতের সব দুর্বলতা, ভয়, অজ্ঞানতা ও সংকীর্ণতা দূর করে দেশকে সত্য, জ্ঞান, ন্যায় ও উদারতার স্বর্গরাজ্যে জাগিয়ে তোলেন। কবির স্বপ্ন—ভারত যেন ভৌগোলিক নয়, নৈতিক, মানসিক ও আত্মিক দিক থেকেও মুক্ত, প্রগতিশীল ও মহৎচেতনার দেশ হয়ে ওঠে।
প্রশ্ন ২: ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির,” — পঙক্তিটি কোথা থেকে গৃহীত এবং ‘চিত্ত’ ও ‘শির’ শব্দের অর্থ কী? এর মাধ্যমে কবি কী ইঙ্গিত করেছেন?
উত্তর: উদ্ধৃত পঙ্ক্তিটি বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘প্রার্থনা’ কবিতা থেকে গৃহীত।
‘চিত্ত’ ও ‘শির’ শব্দের অর্থ হৃদয় বা মন এবং শির’ শব্দের অর্থ মাথা।
এই পঙ্ক্তির মাধ্যমে কবি এমন একটি আদর্শ ভারতবর্ষের স্বপ্ন দেখেছেন, যেখানে মানুষের মনে ভয় থাকবে না এবং তারা গর্বের সঙ্গে মাথা উঁচু করে জীবনযাপন করবে।
কবির মতে, ভয়হীন মন ও উচ্চশির—এই দুটি মানুষের আত্মশক্তি, নৈতিকতা এবং কর্মসাধনার প্রধান শর্ত। তাই তিনি এমন সমাজ কল্পনা করেন, যেখানে সংকীর্ণতা, ভয় বা অবনতির স্থান নেই; মানুষ আত্মবিশ্বাস, মানবিকতা ও নৈতিক মূল্যবোধে বলীয়ান হয়ে এগিয়ে যাবে।
প্রশ্ন ৩: প্রার্থনা’ কবিতায় কবি কী প্রার্থনা করেছেন? সেই প্রার্থনা কীভাবে পূরণ হতে পারে?
উত্তর: ‘প্রার্থনা’ কবিতায় কবি এমন এক দেশ প্রার্থনা করেছেন, যেখানে মানুষের চিত্ত হবে ভয়মুক্ত, তারা গৌরবের সঙ্গে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে এবং জ্ঞান থাকবে মুক্ত। সংকীর্ণতা, কুসংস্কার ও অযথা আচারের দেওয়াল ভেঙে মানুষ আন্তরিক বাক্যে, সত্য চিন্তায় ও অবাধ কর্মধারায় নিজেদের উন্নতির পথে এগিয়ে যাবে। কবি শেষ পর্যন্ত ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেছেন যেন তিনি ভারতবর্ষকে সত্য, ন্যায়, জ্ঞান ও মানবতার স্বর্গে জাগ্রত করেন।
এই প্রার্থনা তখনই পূরণ হতে পারে, যখন দেশের মানুষ নিজের মনে ভয়কে স্থান না দিয়ে সাহস ও আত্মবিশ্বাস অর্জন করবে। শিক্ষা ও মুক্ত চিন্তাকে ধারণ করে তারা সংকীর্ণতা, কুসংস্কার ও তুচ্ছ আচারের বন্ধন থেকে নিজেদের মুক্ত করবে। মানুষ যদি যুক্তিবোধে, নৈতিকতায় ও মানবিকতায় সমৃদ্ধ হয়ে সমাজে সত্য, ন্যায় ও দায়িত্ববোধ প্রতিষ্ঠা করে, তবে কবির কল্পিত আদর্শ ভারতবর্ষ বাস্তবে গড়ে উঠতে পারে। তখনই দেশ প্রকৃত অর্থে সেই স্বর্গীয় অবস্থায় পৌঁছবে, যার জন্য কবি ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেছিলেন।
আরও দেখো : হারুন সালেমের মাসি গল্পের প্রশ্ন উত্তর
প্রশ্ন ৪: ‘প্রার্থনা’ কবিতার নামকরণের সার্থকতা বিচার করো।
উত্তর: কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রার্থনা’ কবিতার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ঈশ্বরের কাছে একটি আদর্শ দেশের জন্য প্রার্থনা করেছেন। তিনি এমন এক ভারতবর্ষের কল্পনা করেন, যেখানে মানুষের মন হবে ভয়শূন্য, মাথা থাকবে উঁচু, জ্ঞান থাকবে মুক্ত এবং সংকীর্ণতার দেওয়াল মানুষের পথ রুদ্ধ করবে না। এ দেশে মানুষের বাক্য আসবে হৃদয়ের গভীর থেকে এবং কর্মধারা হবে অবাধ ও সৃজনশীল। কুসংস্কার, তুচ্ছ আচারের মরুভূমি মানুষের বিবেককে গ্রাস করতে পারবে না।
কবিতার শেষ অংশে কবি আরও স্পষ্টভাবে ঈশ্বরকে আহ্বান জানিয়ে বলেন—“নিজ হস্তে নির্দয় আঘাত করি, পিতঃ, ভারতেরে সেই স্বর্গে করো জাগরিত।” এই আহ্বানই প্রকাশ করে যে পুরো কবিতাই গভীর হৃদয় থেকে উচ্চারিত এক আন্তরিক প্রার্থনা। মানুষের নৈতিক জাগরণ, মুক্ত চিন্তা, সত্য, ন্যায় ও মানবতার প্রতিষ্ঠাই তাঁর চরম কামনা।
এই কারণে বলা যায়, কবিতাটির মূলভাব, উদ্দেশ্য ও আবহ পুরোপুরি একটি আধ্যাত্মিক ও মানবিক প্রার্থনার মতো। তাই ‘প্রার্থনা’ নামটি শুধু যথার্থই নয়, এক কথায়—অত্যন্ত সার্থক।
প্রশ্ন ৫: “জ্ঞান যেথা মুক্ত, যেথা গৃহের প্রাচীর আপন প্রাঙ্গণতলে দিবসশর্বরী বসুধারে রাখে নাই খণ্ড ক্ষুদ্র করি”— ‘মুক্ত’ জ্ঞান বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন? ‘বসুধা’ কেমন করে কীসের দ্বারা ‘খণ্ড’ ও ‘ক্ষুদ্র’ হয়ে যায়?
উত্তর : ‘মুক্ত’ জ্ঞান বলতে কবি এমন জ্ঞানচর্চাকে বুঝিয়েছেন, যেখানে কোনো বাধা, নিষেধ বা সংকীর্ণতা নেই। যে দেশে মানুষ স্বাধীনভাবে শিক্ষা লাভ করতে পারে, প্রশ্ন করতে পারে, যুক্তি দিতে পারে এবং সত্য অনুসন্ধান করতে পারে—সেই জ্ঞানই ‘মুক্ত জ্ঞান’। পরাধীন দেশে শাসকরা মানুষের শিক্ষা সীমিত করে রাখে, যাতে মানুষ প্রতিবাদী হতে না পারে। কিন্তু মুক্ত জ্ঞান মানুষের হৃদয়কে বৃহৎ করে, কুসংস্কার দূর করে এবং সত্য, যুক্তি ও আলোচনার পথ উন্মুক্ত করে। কবির কল্পিত দেশে এই স্বাধীন জ্ঞানচর্চাই মানুষের প্রকৃত মুক্তির পথ সৃষ্টি করবে।
‘বসুধা’ অর্থ পৃথিবী বা মানবসমাজ। প্রকৃতপক্ষে পৃথিবী এক ও অভিন্ন, কিন্তু মানুষের সংকীর্ণতার কারণে সেটি খণ্ড ও ক্ষুদ্র হয়ে পড়ে। জাতিভেদ, ধর্মভেদ, ভাষাভেদ, গোষ্ঠীভেদ ও আঞ্চলিকতা মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে। আবার রাজনৈতিক স্বার্থে শাসকেরাও মানুষকে বিভক্ত করে রাখে। যখন মানুষ মুক্ত জ্ঞান থেকে বঞ্চিত হয়, তাদের মন সংকীর্ণ হয়, কুসংস্কার, স্বার্থপরতা ও হিংসা জন্ম নেয়। তখন তারা নিজেদের ছোট প্রাঙ্গণ বা গণ্ডির মধ্যেই আবদ্ধ থাকে। এই সংকীর্ণতা সমগ্র পৃথিবীকে খণ্ডিত ও ক্ষুদ্র করে তোলে।
এইভাবে কবির মতে, মানুষের মানসিক সংকীর্ণতা ও বিভেদমূলক আচরণের ফলেই পৃথিবী বিভক্ত হয়ে পড়ে এবং তার বিশালতা হারায়। মুক্ত জ্ঞানই সেই সংকীর্ণতা ভেঙে মানবসমাজকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারে।
HS 4th Semester Bengali
প্রার্থনা কবিতার প্রশ্ন উত্তর
প্রশ্ন ৬: “যেথা বাক্য হৃদয়ের উৎসমুখ হতে উচ্ছ্বসিয়া উঠে,” — কোথায় বাক্য ‘উচ্ছ্বসিয়া’ উঠবে বলে কবি কল্পনা করেন? বাক্য সম্পর্কে কবির এরকম কথা বলার কারণ কী?
উত্তর: কবি এমন একটি আদর্শ, স্বাধীন দেশের কথা ভাবেন যেখানে মানুষের বাক্য হৃদয়ের উৎসমুখ থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে উঠে আসবে। সেখানে কথার মধ্যে থাকবে কোনো ভয়, সংকোচ বা কপটতা নয়—বরং সত্য ও আন্তরিকতার প্রবাহ।
হৃদয়ের গভীরতা থেকে উঠে আসা বাক্যই হয় নির্মল, সত্যনিষ্ঠ ও আবেগপূর্ণ। কৃত্রিম বা ভানপূর্ণ কথায় সমাজকে জাগানোর শক্তি নেই। কিন্তু অন্তরের উপলব্ধি থেকে উঠে আসা সত্যবাক্য মানুষকে প্রেরণা দেয়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে সাহায্য করে এবং সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনে।
এই কারণেই কবি চান দেশের মানুষের বাক্য হোক স্বতঃস্ফূর্ত, সত্যভিত্তিক এবং জাগরণ সৃষ্টিকারী।
প্রশ্ন ৭: “যেথা তুচ্ছ আচারের মরুবালুরাশি” — ‘তুচ্ছ আচারের মরুবালুরাশি’ বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন? উদ্ধৃতাংশের তাৎপর্য বিশ্লেষণ করো।
উত্তর: এখানে ‘তুচ্ছ আচারের মরুবালুরাশি’ বলতে কবি বোঝাতে চেয়েছেন—
দেশ ও সমাজে প্রচলিত অর্থহীন, পশ্চাৎপদ, সংকীর্ণ ও কুসংস্কারপূর্ণ আচরণ, যা মানুষের মনকে শুষ্ক বালুরাশির মতো বন্ধ্যা করে দেয়। এসব তুচ্ছ আচারে মানুষ বড় হতে পারে না; তার মন, চিন্তা ও বিচারশক্তি সংকীর্ণ হয়ে পড়ে।
তাৎপর্য বিশ্লেষণ:
এই পঙ্ক্তিতে কবি সতর্ক করেছেন সেই সব অনর্থক ও গোঁড়ামিপূর্ণ আচারের বিরুদ্ধে, যা মানুষের স্বাধীন বিচারশক্তির প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করে। যেমন মরুভূমির বালু প্রবাহমান জলকে গ্রাস করে নেয়, তেমনই তুচ্ছ ও কুসংস্কারময় আচারের স্তূপ বিচারের স্রোতকে থামিয়ে দেয়, মানবমনের বিকাশ রোধ করে।
কবির মতে, যে দেশে চিন্তা-চেতনার অবাধ স্রোত নেই, সেখানে মানবিকতা, যুক্তিবাদ ও অগ্রগতি আসতে পারে না। তাই তিনি ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেছেন যেন ভারত সেই সংকীর্ণ আচারের শুষ্কতা থেকে মুক্ত হয়ে উদার, যুক্তিনিষ্ঠ ও প্রগতিশীল হয়ে ওঠে।
প্রশ্ন ৮: “প্রার্থনা’ কবিতাটি কার, কোন সময়ে লেখা? কবিতায় একাধিকবার ‘যেথা’ শব্দটির মাধ্যমে কবি কী বলতে চেয়েছেন?
উত্তর:‘ ‘প্রার্থনা’ কবিতাটি রচনা করেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
কবিতাটি বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে লেখা হয়। পরে এটি ১৯১০ সালে কবির কাব্যগ্রন্থ ‘গীতাঞ্জলি’-তে অন্তর্ভুক্ত হয়।
কবিতায় ‘যেথা’ শব্দটি বারবার ব্যবহার করে কবি সেই স্বপ্নময় ভারতবর্ষের ছবি এঁকেছেন, যেখানে মানুষ মন ও মেধায় হবে ভয়শূন্য, স্বাধীন ও উদারচেতা।
‘যেথা’-র পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে কবি বোঝাতে চেয়েছেন—
তিনি এমন এক আদর্শ দেশের কল্পনা করছেন, যেখানে জ্ঞান, সত্য, যুক্তি, মানবতা এবং কর্মচেতনার অবাধ প্রবাহ থাকবে। পাশাপাশি ‘যেথা’ শব্দটি জোর দিয়ে বোঝায় যে কবির প্রার্থনা ও প্রত্যাশার লক্ষ্যস্থল তাঁর নিজ দেশ ভারতবর্ষ — অন্য কোনো স্থান নয়।
কুসংস্কার, সংকীর্ণতা, ভয় ও বিভাজনহীন, নৈতিক এবং বৌদ্ধিকভাবে মুক্ত এক ভারত গঠনের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করতেই কবি ‘যেথা’ শব্দটি বারবার ব্যবহার করেছেন।
আরও দেখো: হলুদ পোড়া গল্পের প্রশ্ন উত্তর
প্রশ্ন ৯: রবীন্দ্রনাথের ‘প্রার্থনা’ কবিতাটি স্বদেশভাবনার কবিতা হিসেবে কতটা সার্থক- আলোচনা করো।
উত্তর: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘প্রার্থনা’ কবিতাটি স্বদেশভাবনার কবিতা হিসেবে অত্যন্ত সার্থক। এই কবিতায় কবি এমন এক আদর্শ ভারতবর্ষের স্বপ্ন দেখিয়েছেন, যা কেবল রাজনৈতিক স্বাধীনতাই নয়, মানবিক, নৈতিক ও বৌদ্ধিক মুক্তির শপথে উদ্ভাসিত।
প্রথমত, কবিতাটির প্রেক্ষাপটেই রয়েছে স্বদেশচেতনাকে জাগিয়ে তোলার ইঙ্গিত। উনিশ শতকের শেষভাগে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের নিষ্ঠুরতা, বিশেষত দক্ষিণ আফ্রিকার বুয়র যুদ্ধ, কবির মনে গভীর যন্ত্রণা সৃষ্টি করেছিল। মানবাধিকার লঙ্ঘনের এই বৈশ্বিক ঘটনার মধ্য দিয়েই কবি উপলব্ধি করেন, পরাধীনতা মানুষের অস্তিত্বকে গুঁড়িয়ে দেয়; ফলে তাঁর মনে জেগে ওঠে স্বদেশ-মুক্তির আকাঙক্ষা।
দ্বিতীয়ত, কবি তাঁর দেশকে যে অবস্থায় দেখেছিলেন—জীর্ণ, কুরীতি-আবদ্ধ, ভীরু—সে অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্যই তাঁর উচ্ছ্বসিত প্রার্থনা। তিনি চান এমন ভারত, যেখানে মানুষের চিত্ত হবে ভয়শূন্য, মাথা উঁচু, আর জ্ঞান মুক্ত। এই আদর্শ গুণাবলির চর্চাই তাঁর কাছে সত্যিকারের জাতি-গঠন।
তৃতীয়ত, রবীন্দ্রনাথ মনে করেন জাতির উন্নতির পথে সবচেয়ে বড় বাধা হচ্ছে তুচ্ছ আচারের মরুবালুরাশি, অর্থাৎ কুসংস্কার, অন্ধ আচার, সংকীর্ণতা ও ভেদভাব। এই সব জীর্ণ আচারের দাসত্বমুক্ত হলে তবেই দেশ সত্যিকারের মুক্তির দিকে এগোতে পারবে।
শেষত, কবি কোনো রাজনৈতিক বা ভৌত ‘স্বর্গ’-এর জন্য প্রার্থনা করেননি। তিনি প্রার্থনা করেছেন উন্নত মানব-স্বর্গের, যেখানে মানুষের নৈতিক শক্তি, কর্মচেতনা ও সত্যবোধ বিকশিত হবে। এই মানবমহিমার স্বপ্নই কবিতাটিকে স্বদেশভাবনায় অনন্য উচ্চতায় অধিষ্ঠিত করেছে।
সব মিলিয়ে, ‘প্রার্থনা’ কেবল প্রার্থনাই নয়—এ এক উদার মানবতা, মুক্ত চিন্তা, জাতীয় সম্মান ও মানবিক মুক্তির ঘোষণাপত্র। তাই কবিতাটি স্বদেশচেতনার দিক দিয়ে সম্পূর্ণ সার্থক।
প্রার্থনা কবিতার সারমর্ম
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘প্রার্থনা’ কবিতায় এমন এক আদর্শ দেশের স্বপ্ন দেখিয়েছেন, যেখানে মানুষ মনেপ্রাণে স্বাধীন। যেখানে মানুষের চিত্ত ভয়মুক্ত, মাথা সর্বদা গর্বে উঁচু, আর জ্ঞানচর্চার পথে কোনো বাঁধা নেই। কবি এমন সমাজ চান যেখানে সংকীর্ণতা, ভেদাভেদ বা প্রাচীর তুলে মানুষ মানুষকে ছোট করে না।
সেই স্বপ্নের দেশে মানুষের বাক্য হৃদয়ের গভীরতা থেকে উঠে আসে—কৃত্রিমতা, ভণ্ডামি বা ভয়ের কোনো স্থান নেই। সেখানে কর্মপ্রবাহ অবারিতভাবে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে, আর মানুষ নানা কাজে সফলতা অর্জন করে।
কবি আরও বলেন—কুসংস্কার, অন্ধ আচার ও সংকীর্ণতার মরুভূমি যেন বিচার-বিবেচনার পথকে গ্রাস না করে। মানুষের মধ্যে যেন দুর্বলতা না থাকে, বরং সত্যিকারের পৌরুষ ও নৈতিক সাহস বিকশিত হয়।
অবশেষে, কবি ঈশ্বরের প্রতি প্রার্থনা জানান—নিজ হাতে সকল বাধা দূর করে ভারতবর্ষকে সেই স্বপ্নময় মুক্তির স্বর্গে জাগিয়ে তুলুন, যেখানে মানুষের কর্ম, চিন্তা ও আনন্দে ঈশ্বরই পথপ্রদর্শক।
উচ্চ মাধ্যমিক বাংলা চতুর্থ সেমিস্টার // প্রার্থনা (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর) কবিতার ৫ মার্কের প্রশ্ন উত্তর।