প্রশ্ন : আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিকাশের ধারা সংক্ষেপে আলোচনা করো।
উত্তর: আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিকাশ এক ধারাবাহিক ও বহুমাত্রিক প্রক্রিয়া। ইতিহাসের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই শাস্ত্রটির ধাপে ধাপে বিকাশ ঘটেছে। নিচে তার সংক্ষিপ্ত রূপ তুলে ধরা হলো:
১. জাতিরাষ্ট্রের উৎপত্তি ও প্রারম্ভিক বিকাশ (১৬৪৮ সালের ওয়েস্টফেলিয়া চুক্তি):
ইউরোপে নবজাগরণ ও সংস্কার আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রীয় গঠন ও সার্বভৌমত্বের ধারণা বিকশিত হয়।
১৬৪৮ সালে ওয়েস্টফেলিয়া চুক্তি-র মাধ্যমে আধুনিক জাতিরাষ্ট্র ব্যবস্থা চালু হয়।
এই চুক্তি অনুযায়ী প্রতিটি রাষ্ট্র স্বাধীনভাবে অন্য রাষ্ট্রের সঙ্গে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপন করতে পারে।
এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রাথমিক ভিত্তি স্থাপিত হয়।
২. প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও তার পরবর্তী বিকাশ (১৯১৪–১৯১৯):
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা বিশ্ব নেতাদের শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সচেতন করে তোলে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসনের চোদ্দো দফা প্রস্তাব শান্তির লক্ষ্যে একটি গঠনমূলক পদক্ষেপ ছিল।
এই সময় গঠিত হয় জাতিপুঞ্জ (League of Nations), যা আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় ভূমিকা রাখে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়টি এই পর্যায়ে এসে গবেষণার উপযোগী একাডেমিক শাস্ত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
৩. দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও পরবর্তী সময় (১৯৩৯–১৯৪৫ এবং পরে):
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসাত্মক অভিজ্ঞতা মানুষের মধ্যে আবার শান্তিপ্রবণ মানসিকতা গড়ে তোলে।
যুদ্ধোত্তর বিশ্বে গঠিত হয় জাতিসংঘ (United Nations), যা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের এক নতুন অধ্যায় সূচিত করে।
এই সময় থেকেই আন্তর্জাতিক সম্পর্ক একটি স্বতন্ত্র পাঠ্যবিষয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়।
পাশাপাশি শুরু হয় ঠান্ডা যুদ্ধ, যার ফলে বিশ্ব রাজনীতি দ্বিমেরুতা ভিত্তিক হয়ে ওঠে (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বনাম সোভিয়েত রাশিয়া)।
৪. সাম্প্রতিক প্রবণতা ও আধুনিক বিকাশ (১৯৯০-এর দশক থেকে বর্তমান)
সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের মাধ্যমে ঠান্ডা যুদ্ধের অবসান ঘটে এবং বিশ্বে একমেরুতা (unipolarity) প্রতিষ্ঠা পায় — যার নেতৃত্বে থাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
বিশ্বায়ন, প্রযুক্তিগত বিপ্লব, এবং অরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের (যেমন NGO, MNC) ভূমিকা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিধি আরও বিস্তৃত করে।
বর্তমানে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক রাষ্ট্রের বাইরেও মানবাধিকার, পরিবেশ, নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও সংস্কৃতি ইত্যাদি বিষয়ের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।
মূল্যায়ন:
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এক সময় রাষ্ট্রীয় কূটনীতির একটি দিক হিসেবে বিবেচিত হতো। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সীমানা ছাড়িয়ে সমাজবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। এখন এটি একটি বহুমাত্রিক ও আন্তঃসম্পর্কিত শাস্ত্র, যা আধুনিক বিশ্বের নানা প্রেক্ষাপটকে ধারণ করে।
প্রশ্ন : আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিকাশের ধারা সংক্ষেপে আলোচনা করো।
উত্তর: আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিকাশের ধারা আলোচনা
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক (International Relations) একটি স্বতন্ত্র জ্ঞানচর্চার শাখা হলেও এর বিকাশ বহুদিনের প্রক্রিয়ার ফল। রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্ক, কূটনীতি, যুদ্ধ, সন্ধি, পররাষ্ট্রনীতি ইত্যাদি বিষয় প্রাচীনকাল থেকেই বিদ্যমান থাকলেও তা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায় অনেক পরে। ইতিহাসে সময়কালভিত্তিক আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিকাশকে মূলত কয়েকটি পর্যায়ে ভাগ করা যায়।
১. প্রাক্-শিল্পবিপ্লব যুগ:
এই পর্যায়ে রাষ্ট্র ও রাজ্য ব্যবস্থার মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে দার্শনিক ও চিন্তাবিদরা চিন্তা-ভাবনা করেন।
থুকিডিডিস-এর History of the Peloponnesian War, কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র, ম্যাকিয়াভেলির The Prince উল্লেখযোগ্য কাজ।
এই সময় চিন্তা ছিল বিচ্ছিন্ন ও কাঠামোবিহীন।
২. জাতিরাষ্ট্রের উদ্ভব (1648 খ্রিস্টাব্দ):
ওয়েস্টফেলিয়া চুক্তির (Peace of Westphalia) মাধ্যমে আধুনিক সার্বভৌম জাতিরাষ্ট্রের জন্ম হয়।
ইউরোপে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং কূটনৈতিক সম্পর্ক কাঠামোতে ঢুকতে থাকে।
১৮১৫ সালের ভিয়েনা কংগ্রেসও কূটনীতিকে শক্তিশালী করে।
৩. শিল্পবিপ্লব ও যোগাযোগের উন্নয়ন (১৮শ শতাব্দী):
রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বাণিজ্য, সাম্রাজ্য বিস্তার ও প্রযুক্তি বিনিময়ের ফলে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয়।
উপনিবেশবাদ এবং গোপন কূটনীতির উত্থান ঘটে।
বেনথাম, নর্ম্যান অ্যাঞ্জেল, পল রেইন্স আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে তাত্ত্বিক ভিত্তি গড়ে তোলেন।
৪. প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর যুগ (১৯১৯-এর পর):
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসাত্মক প্রভাব আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে ব্যাপক সচেতনতা সৃষ্টি করে।
উড্রো উইলসনের চোদ্দো দফা প্রস্তাব ও লেনিনের গোপন চুক্তি ফাঁস আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে জনমুখী ও স্বচ্ছ করে তোলে।
জাতিসংঘের পূর্বসূরি লিগ অফ নেশনস গঠিত হয়।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পড়ানো শুরু হয় এবং একে একটি স্বতন্ত্র পাঠ্যবিষয় হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
৫. দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর যুগ (১৯৪৫-এর পর):
জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠা (১৯৪৫) আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা, শান্তি রক্ষা ও বৈশ্বিক সহযোগিতার নতুন দিক উন্মোচন করে।
বিশ্ব রাজনীতি দ্বিমেরুতে বিভক্ত হয়ে পড়ে – মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বনাম সোভিয়েত ইউনিয়ন (ঠান্ডা লড়াই)।
জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন (NAM) আত্মপ্রকাশ করে।
৬. আধুনিক যুগ ও প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশ:
বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা কেন্দ্র, এবং থিংক ট্যাঙ্ক যেমন –
London School of Economics,
Graduate Institute of International Studies (Geneva),
Carnegie Endowment,
Chatham House ইত্যাদি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক চর্চাকে শাস্ত্ররূপে গড়ে তোলে।
১৯৫৯ সালে প্রতিষ্ঠিত ISA এবং ১৯৭৫ সালে BISA এর মতো সংগঠন এই শাস্ত্রের গবেষণায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করে।
মূল্যায়ন:
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়টি ইতিহাসের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের প্রতিক্রিয়ায় বিকশিত হয়েছে। বিশ্বযুদ্ধ, শিল্পবিপ্লব, ঠান্ডা লড়াই, উপনিবেশবাদ, জাতিসংঘ, এবং আধুনিক থিংক ট্যাঙ্ক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবদান একে একটি পূর্ণাঙ্গ, স্বতন্ত্র ও প্রাসঙ্গিক সামাজিক বিজ্ঞান শাস্ত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।