হলুদ পোড়া গল্পের প্রশ্ন উত্তর মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় / উচ্চ মাধ্যমিক চতুর্থ সেমিস্টার বাংলা

হলুদ পোড়া (মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়) গল্পের ৫ ও ২ নাম্বারের প্রশ্ন উত্তর / Class 12 4th Semester 2025-2026

ক্লাস 12 বাংলা চতুর্থ সেমিস্টার হলুদ পোড়া (মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়)

‘হলুদ পোড়া’ গল্পের সারাংশ ও বিশ্লেষণ:

“মানুষের অন্ধবিশ্বাসই মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রু।” — এই কথাটিই যেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘হলুদ পোড়া’ গল্পের মূল বক্তব্য।

‘হলুদ পোড়া’ একদিকে যেমন দুটি রহস্যময় মৃত্যুর লোমহর্ষক কাহিনি, তেমনি অন্যদিকে এটি যুক্তিবাদী মনের কাছে কুসংস্কারের অসহায় আত্মসমর্পণের কাহিনি। গল্পের শুরুতেই দুটি রহস্যময় মৃত্যু গ্রামবাসীর মনে আতঙ্ক ও কৌতূহল সৃষ্টি করে—
একজন মাঝবয়সী বলাই চক্রবর্তী এবং আরেকজন ষোলো-সতেরো বছরের অন্তঃসত্ত্বা তরুণী শুভ্রা। বলাইয়ের চরিত্র খারাপ হওয়ায় তার মৃত্যুতে কেউ তেমন দুঃখ পায়নি, কিন্তু নিরীহ শুভ্রার মৃত্যু গ্রামবাসীকে গভীরভাবে নাড়া দেয়।

এই ঘটনার পর বলাইয়ের ভাইপো নবীন গ্রামে ফিরে এসে সম্পত্তির দায়িত্ব নেয় এবং খুনিকে ধরিয়ে দিতে পুরস্কার ঘোষণা করে। ঠিক তখনই নবীনের স্ত্রী দামিনী অসুস্থ হয়ে পড়ে। গ্রামের ওঝা কুঞ্জ জানায়, দামিনীর ওপর শুভ্রার প্রেতাত্মা ভর করেছে, এবং সেই আত্মা জানায় যে বলাই-ই শুভ্রাকে খুন করেছিল। ফলে গ্রামের মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করে যে ভূতই সত্য প্রকাশ করেছে।

গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র ধীরেন, শুভ্রার দাদা—একজন উচ্চশিক্ষিত ও যুক্তিবাদী স্কুলশিক্ষক। তার জীবন বিজ্ঞানভিত্তিক চিন্তায় গঠিত হলেও গ্রামের কুসংস্কার ও বোনের রহস্যময় মৃত্যুর ধাক্কায় তার মানসিক ভারসাম্য নষ্ট হতে থাকে। বিদ্যালয়ে ছাত্র-শিক্ষক ও গ্রামবাসীর কৌতূহলী দৃষ্টি তাকে অস্থির করে তোলে। তার স্ত্রী শাস্তি নানা টোটকা, তাবিজ ও পুজোর আয়োজন করে, কিন্তু ধীরেন প্রতিবাদ করতে পারে না—বরং ধীরে ধীরে নিজের যুক্তিবোধ হারিয়ে ফেলে।

গল্পের চূড়ান্ত পরিণতিতে ধীরেনের ওপর ‘বলাইয়ের আত্মা’ ভর করেছে বলে ঘোষণা করে ওঝা কুঞ্জ। ধীরেন অচেতন অবস্থায় বলে ওঠে—
“আমি বলাই, আমিই শুভ্রাকে খুন করেছি।”
এই স্বীকারোক্তির মাধ্যমে আমরা দেখি, বিজ্ঞানে বিশ্বাসী শিক্ষিত মানুষও কুসংস্কার ও সামাজিক চাপে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়।

হলুদ পোড়া গল্পের মূল চারটি ঘটনা:

১) বলাই ও শুভ্রার রহস্যময় মৃত্যু — গল্পের সূচনাবিন্দু।

২) দামিনীর ওপর শুভ্রার আত্মা ভর করা — কুসংস্কারের বিস্তার শুরু।

৩) ধীরেনের যুক্তিবাদী মানসিকতার ভাঙন — সমাজ ও সংস্কারের চাপে যুক্তির পরাজয়।

৪) ধীরেনের আত্মভূত অবস্থায় খুনের স্বীকারোক্তি — গল্পের চূড়ান্ত ট্র্যাজিক পরিণতি।

গল্পের মূল বক্তব্য:

‘হলুদ পোড়া’ গল্পে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় দেখিয়েছেন, শিক্ষিত সমাজও কখনো কখনো অজ্ঞতার কাছে পরাজিত হয়। যুক্তিবাদী মন যখন অন্ধবিশ্বাসের ঘেরাটোপে পড়ে, তখন বাস্তবতা ও কল্পনার সীমারেখা ঘুলিয়ে যায়। ফলে সমাজে কুসংস্কারের শক্তি অটুট থেকে যায় এবং যুক্তি নিঃশেষ হয়ে পড়ে।

হলুদ পোড়া (মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়) গল্পের ৫ মার্কের প্রশ্ন উত্তর

Q.১ ছোটোগল্প হিসেবে ‘হলুদ পোড়া’ গল্পটি কতদূর সার্থক তা নিজের ভাষায় আলোচনা করো।

উত্তর: মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘হলুদ পোড়া’ ছোটোগল্পটি ছোটোগল্পের সমস্ত বৈশিষ্ট্য ধারণ করে অত্যন্ত সার্থক ও শিল্পসমৃদ্ধ রচনা।

(১) একক প্রতীতি:
গল্পটি একক প্রতীতির উপর ভিত্তি করে গঠিত। বলাই চক্রবর্তী ও শুভ্রার রহস্যজনক খুন এবং তার পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ পাঠকের মনে এক গভীর মানসিক সঙ্কট ও ভয়ের ছাপ ফেলে — যা ছোটোগল্পের প্রধান বৈশিষ্ট্য।

(২) বাস্তবতা:
মানিকের গল্প বাস্তব জীবনের কাছাকাছি। গ্রামীণ সমাজের কুসংস্কার, গুনিনের চিকিৎসা, মানুষের অজ্ঞানতা — সবকিছুই বাস্তব অভিজ্ঞতার প্রতিফলন। গল্পের চরিত্ররা জীবন্ত ও বিশ্বাসযোগ্য।

(৩) সংক্ষিপ্ততা ও ঘনীভবন:
গল্পটি আকারে সংক্ষিপ্ত, কিন্তু ঘটনায় ঘন। অপ্রয়োজনীয় বর্ণনা নেই। কয়েকটি চরিত্র ও সীমিত ঘটনাক্রমের মধ্যেই লেখক একটি রহস্যময় পরিবেশ সৃষ্টি করেছেন।

(৪) আখ্যানের গতি ও পরিণতি:
গল্পটি তিন দিনের ব্যবধানে সংঘটিত দুটি খুনকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয় এবং ধীরেনের মানসিক ভাঙনের মধ্যে গল্পের পরিণতি ঘটে। এই ঋজু ও লক্ষ্যাভিমুখী গতি ছোটোগল্পের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

(৫) শিল্পসুষমা ও মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা:
মানিক গল্পটিতে মানুষের অজ্ঞানতা, কুসংস্কার, ভয়, এবং মানসিক ব্যাধির সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ করেছেন। তাই গল্পটি কেবল একটি রহস্যগল্প নয়, এটি মানবমনের অন্ধকার দিকের প্রতিচ্ছবি।

উপসংহার:

সব দিক বিবেচনায়, ‘হলুদ পোড়া’ ছোটোগল্পটি সংক্ষিপ্ত পরিসরে গভীর প্রতীতি, বাস্তব জীবনচিত্র, রহস্য ও মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ—সবকিছু মিলিয়ে এক অনন্য শিল্পকীর্তি। তাই এটি ছোটোগল্প হিসেবে সম্পূর্ণ সার্থক।

Q.২ শুধু জ্যান্ত মানুষ কি মানুষের গলা টিপে মারে? আর কিছু মারে না?” – উদ্ধৃতিটি কে, কোন পরিস্থিতিতে বলেছে? পরবর্তী পরিস্থিতি কী হয়েছিল তার বিবরণ দাও।

উত্তর: উদ্ধৃতিটি— “শুধু জ্যান্ত মানুষ কি মানুষের গলা টিপে মারে? আর কিছু মারে না?” — কথাটি বলেছেন বুড়ো ঘোষাল, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছোটোগল্প ‘হলুদ পোড়া’ থেকে নেওয়া।

আলোচ্য পরিস্থিতি:

গল্পে দেখা যায়, কৈলাস ডাক্তার যখন দামিনীকে ঘুমপাড়ানো ইনজেকশন দেন, তখন অচেতন অবস্থায় দামিনীর মুখ দিয়ে শুভ্রার আত্মা কথা বলে বলে ওঠে যে, বলাই চক্রবর্তী-ই তাকে খুন করেছে। এই সময় উপস্থিত বুড়ো ঘোষাল বলাইয়ের পক্ষ নিয়ে উক্ত কথাটি বলেন। তিনি বোঝাতে চান, মানুষের মৃত্যু শুধু মানুষের হাতে হয় না—ভাগ্য, অশরীরী শক্তি, কিংবা অজানা কিছু কারণেও মৃত্যু ঘটতে পারে। বলাইয়ের প্রতি তাঁর কৃতজ্ঞতা ও নির্ভরতার কারণেই তিনি এ কথা বলেন।

পরবর্তী পরিস্থিতি:

বুড়ো ঘোষালের এই কথাগুলি গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত শুভ্রার দাদা ধীরেনের কানে পৌঁছায়। সে বিষয়টি গভীরভাবে ভাবতে থাকে, কিন্তু তার মনের ভারসাম্য নষ্ট হতে শুরু করে। ক্রমে সে মানসিক বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়ে এবং একসময় গুনিন কুঞ্জ মাঝি তার ‘হলুদ পোড়া’ চিকিৎসা শুরু করে। চিকিৎসার সময় ধীরেনের মুখ দিয়ে বলাই চক্রবর্তী বলছে— “শুভ্রাকে আমি খুন করেছি।”

এইভাবে বুড়ো ঘোষালের উক্তিটি গল্পের রহস্য ও মানসিক টানাপোড়েনকে আরও গভীর করে তোলে।

Q.৩ “তখন একটা কাঁচা হলুদ পুড়িয়ে কুঞ্জ তার নাকের কাছে ধরল।” —
‘তখন’ বলতে কোন্‌ পরিস্থিতির কথা বোঝানো হয়েছে? নাকের কাছে কাঁচা হলুদ পোড়া ধরার ফল কী হয়েছিল তা আলোচনা করো।

উত্তর: কথাকার মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯০৮–১৯৫৬)-এর ‘হলুদ পোড়া’ গল্প থেকে উদ্ধৃত অংশটি নেওয়া হয়েছে।

‘তখন’-কার পরিস্থিতি:

নবীনের স্ত্রী দামিনী হঠাৎ এক অদ্ভুত রোগে আক্রান্ত হয়। গ্রামবাসীরা বিশ্বাস করে, তার উপর অশরীরী আত্মা ভর করেছে। এই রোগ সারাতে গুনিন কুঞ্জ মাঝি নবীনের বাড়িতে আসে। কুঞ্জ প্রথমে মন্ত্রপূত জল ছিটিয়ে বাড়ি শুদ্ধ করে এবং দামিনীকে দাওয়ার খুঁটির সঙ্গে শক্ত করে বেঁধে রাখে। চারদিকের মানুষদের ভয় দেখিয়ে দূরে সরিয়ে দিয়ে সে ঝাড়ফুঁক শুরু করে— তখনই এই ঘটনাটি ঘটে।

হলুদ পোড়ার প্রতিক্রিয়া:

গুনিন কুঞ্জ এক টুকরো কাঁচা হলুদ পুড়িয়ে দামিনীর নাকের কাছে ধরে। এর ফলে দামিনীর নিস্পন্দ চোখ ধীরে ধীরে বিস্ফারিত হয়ে ওঠে, তার সারা শরীরে শিহরণ খেলে যায়, এবং সে যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে। এরপর কুঞ্জ আক্রান্ত দামিনীর মুখ দিয়ে অশরীরী আত্মার পরিচয় জানতে চায়— তখনই গল্পের রহস্যময় মোড় সৃষ্টি হয়।

Q.৪ “চারিদিকে হইচই পড়ে গেল বটে, কিন্তু লোকে খুব বিস্মিত হল না।” —
চারিদিকে কেন হইচই পড়ে গেল? লোকে বিস্মিত না হয়ে কী হয়েছিল তা আলোচনা করো।

উত্তর: উক্তিটি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিখ্যাত ছোটোগল্প ‘হলুদ পোড়া’ থেকে নেওয়া। এই বাক্যের মধ্যে গল্পের সূচনালগ্নের ঘটনাপ্রবাহ ও সমাজবাসীর মনোভাব সুন্দরভাবে প্রকাশ পেয়েছে।

চারিদিকে হইচই পড়ার কারণ:

গল্পের শুরুতেই গ্রামজুড়ে এক ভয়াবহ সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে—
একজন মাঝবয়সি পুরুষ বলাই চক্রবর্তী এবং এক ষোলো-সতেরো বছরের মেয়ে শুভ্রা খুন হয়েছে। বলাইয়ের মৃতদেহ পাওয়া যায় গ্রামের দক্ষিণে মজা পুকুরের ধারে পুরনো গজারি গাছের নিচে, মাথা লাঠির আঘাতে চূর্ণবিচূর্ণ। এভাবেই পরিচিত ও বিতর্কিত ব্যক্তির এমন মৃত্যুতে গোটা গ্রামে চাঞ্চল্য, কৌতূহল ও হইচই ছড়িয়ে পড়ে।

লোকে বিস্মিত না হয়ে কী করেছিল:

যদিও গ্রামজুড়ে হইচই পড়ে, তবু কেউ বিস্মিত হয়নি। কারণ বলাই চক্রবর্তী ছিলেন অত্যন্ত উদ্ধত, লোভী ও আত্মকেন্দ্রিক মানুষ। তিনি অন্যের ক্ষতি করে নিজের স্বার্থসিদ্ধি করতেন। ফলে গ্রামের লোকেরা তার মৃত্যুকে অবশ্যম্ভাবী ফল বলে মেনে নেয়। অনেকেই মনে মনে বলাইয়ের মৃত্যুকে ন্যায্য শাস্তি হিসেবে দেখে। তাই লোকে কৌতূহলী হলেও শোকাহত বা বিস্মিত হয়নি; বরং তারা ঘটনার বিশ্লেষণ ও মন্তব্যে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

Q.৫ “…এই দুর্লভ রোমাঞ্চ থেকে তাদের বঞ্চিত করার ক্ষমতা নবীনের নেই।” — কোন ঘটনাকে ‘দুর্লভ রোমাঞ্চ’ বলা হয়েছে? তাদের বঞ্চিত করার ক্ষমতা নবীনের কেন নেই বলে কথাকার মনে করেছেন — আলোচনা করো।

উত্তর: আলোচ্য উক্তিটি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘হলুদ পোড়া’ গল্প থেকে গৃহীত।

‘দুর্লভ রোমাঞ্চ’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে:

গল্পে নবীনের স্ত্রী দামিনীর শরীরে খুন হওয়া মেয়ে শুভ্রার আত্মা ভর করেছে বলে গ্রামে গুজব ছড়ায়। সেই ‘ভূত ছাড়ানোর’ জন্য গুনিন কুঞ্জ মাঝিকে ডাকা হয়। গুনিন মন্ত্র পড়ে, তাবিজ ঝাড়ে, আগুনের ছ্যাঁকা দেয়—এই দৃশ্য দেখতে আশপাশের প্রায় তিরিশ-পঁয়ত্রিশ জন পুরুষ-নারী জড়ো হয়। ভয়, কৌতূহল আর অলৌকিক বিশ্বাসের মিশ্র অনুভূতি তাদের মনে এক অদ্ভুত উত্তেজনা সৃষ্টি করে। এই অস্বাভাবিক ও রোমাঞ্চকর অবস্থাকেই কথাকার ‘দুর্লভ রোমাঞ্চ’ বলেছেন।

নবীনের বঞ্চিত করার ক্ষমতা না থাকার কারণ:

নবীন শিক্ষিত, শহুরে এবং যুক্তিবাদী চিন্তাধারার মানুষ হলেও, গ্রামীণ সমাজে কুসংস্কার গভীরভাবে প্রোথিত। গ্রামের সাধারণ মানুষ গুনিনের বিদ্যা ও ভূতপ্রেতের অস্তিত্বে অগাধ বিশ্বাস রাখে। নবীনের একার পক্ষে সেই গাঁ-সমাজের কুসংস্কার ভাঙা সম্ভব নয়। ফলে, এই অলৌকিক ঘটনার ‘রোমাঞ্চ’ থেকে গ্রামবাসীদের বঞ্চিত করার ক্ষমতা তার নেই — কথাকার এই কারণেই এমন মন্তব্য করেছেন।

Q.৬ “রও, বাছাধন রও। এখনই হয়েছে কী? মজাটি টের পাওয়াচ্ছি তোমায়।
— কথাটি কে, কাকে উদ্দেশ করে বলেছে? মজাটি বক্তা কীভাবে টের পাইয়েছিল?

উত্তর:
বক্তা ও শ্রোতা:

আলোচ্য উক্তিটি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘হলুদ পোড়া’ গল্প থেকে নেওয়া। এখানে কথাটি বলেছে গুনিন কুঞ্জ মাঝি, আর সে এই কথা বলেছে দামিনীকে— যে নবীনের স্ত্রী এবং যার শরীরে শুভ্রার আত্মা ভর করেছে বলে ধারণা করা হয়।

‘মজাটি’ টের পাওয়া:

‘মজাটি’ বলতে বোঝানো হয়েছে ভয় ও যন্ত্রণার এমন এক পরিণতি, যার মাধ্যমে ভূতে ভর-করা দামিনী তথা শুভ্রার আত্মাকে ভয় দেখিয়ে বশে আনার কৌশল।
কুঞ্জ মাঝি প্রথমে পরিবেশে ভয় ও উত্তেজনা সৃষ্টি করে—সবাইকে বলে “ভর সাঁঝে ভর করেছেন, সহজে ছাড়বেন না।” এরপর দামিনীর লম্বা চুল খুঁটির সঙ্গে শক্ত করে বাঁধে, যাতে সে না বসতে পারে, না পালাতে পারে। তারপর মালসায় আগুন জ্বালিয়ে শুকনো পাতা, শিকড় ও হলুদ পোড়িয়ে তীব্র গন্ধযুক্ত ধোঁয়া তৈরি করে। এই যন্ত্রণাদায়ক অবস্থার মধ্যেই সে দামিনীকে ভয় দেখিয়ে বলে— “চাটি টের পাওয়াচ্ছি তোমায়।”

এইভাবে কুঞ্জ মাঝি নিজের কৌশল ও ধোঁয়ার যন্ত্রণা দিয়ে ‘ভূত’ অর্থাৎ দামিনীর ভেতরের ভয়কে ‘টের’ পাইয়েছিল এবং নিজেকে গুনিন হিসেবে সার্থক প্রমাণ করেছিল।

Q.৭ “……. গা-সুদ্ধ লোক যেন অপ্রস্তুত হয়ে রইল।” গ্রামের লোকদের এই অপ্রস্তুত হওয়ার কারণ কাহিনি অবলম্বনে আলোচনা করো।

উত্তর: বিখ্যাত কথাশিল্পী মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘হলুদ পোড়া’ গল্পের উল্লিখিত উক্তিটির মাধ্যমে গ্রামের মানুষের হঠাৎ ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলির প্রতি বিস্ময়, বিভ্রান্তি ও হতবাক হওয়ার অবস্থা প্রকাশ পেয়েছে।

গ্রামের মানুষের অপ্রস্তুত হওয়ার কারণ-

(১) ঘটনার অভাবনীয়তা:

যে গ্রামে বহু বছর ধরে কোনো অপরাধ ঘটেনি, সেই নিরিবিলি গ্রামে হঠাৎ পরপর দুইটি রহস্যময় মৃত্যু— বলাই চক্রবর্তী ও তরুণী শুভ্রার— সংঘটিত হওয়া ছিল একেবারেই অপ্রত্যাশিত।
বলাইয়ের মৃত্যু যদিও তার খারাপ চরিত্রের জন্য অনেকের কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়নি, কিন্তু নিরীহ শুভ্রার মৃত্যুই গ্রামবাসীকে সবচেয়ে বেশি আতঙ্কিত ও বিস্মিত করে তোলে।

(২) শুভ্রার সামাজিক পরিচিতি:

শুভ্রা ছিল গ্রামের এক সাধারণ গৃহস্থ পরিবারের মেয়ে। সে কারো সঙ্গে বিরোধ বা সম্পর্কের জটিলতায় জড়ায়নি।
সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় বাপের বাড়িতে এসে এমনভাবে মারা যাওয়া— এই ঘটনাটি গ্রামের মানুষকে অবিশ্বাস্য ও রহস্যময় মনে হয়েছিল।

(৩) দুটি মৃত্যুর মধ্যে যোগসূত্রের অভাব:

বলাই ও শুভ্রার মধ্যে কোনো দৃশ্যমান সম্পর্ক বা যোগসূত্র ছিল না। ফলে দুটি মৃত্যুর কারণ, খুনি কিংবা উদ্দেশ্য নিয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট ধারণা তৈরি হয়নি।
এই অনিশ্চয়তা ও অজ্ঞতার মধ্যেই গ্রামের মানুষ স্তব্ধ ও অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে।

মূল্যায়ন:

‘হলুদ পোড়া’ গল্পে গ্রামবাসীর অপ্রস্তুত হয়ে থাকা ছিল অপ্রত্যাশিত ঘটনা, শুভ্রার নিরীহ চরিত্র ও রহস্যঘেরা মৃত্যুর ফলস্বরূপ। ঘটনাগুলির অস্বাভাবিকতা ও যুক্তিহীনতা তাদের মনে ভয়, বিস্ময় ও কুসংস্কারের বীজ বপন করেছিল।

Q.৮ ‘হলুদ পোড়া’ গল্প অবলম্বনে ধীরেন চরিত্রটি বিশ্লেষণ করো।

ভূমিকা: সমাজসচেতন কথাশিল্পী মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর বাস্তবধর্মী গল্পগুলির মাধ্যমে গ্রামীণ জীবনের অন্তর্লোক ও মানুষের মানসিক সংঘাতকে নিপুণভাবে তুলে ধরেছেন। তাঁর লেখা ছোটগল্প ‘হলুদ পোড়া’-য় ধীরেন চাটুজ্যে এমন এক চরিত্র, যার মাধ্যমে লেখক যুক্তি ও কুসংস্কারের সংঘাতকে জীবন্ত করে তুলেছেন। বাস্তবতার মাটিতে দাঁড়িয়ে ধীরেন চরিত্রটি গল্পের মূল ভাবকে গভীরতা দিয়েছে।

ধীরেন চরিত্রের বিশ্লেষণ:

(১) শিক্ষিত ও যুক্তিবাদী ব্যক্তি:

ধীরেন পদার্থবিজ্ঞানে বিএসসি পাশ করা একজন শিক্ষিত ব্যক্তি। সে গ্রামের স্কুলে ভূগোলের শিক্ষক।
গল্পের শুরুতে তাকে আমরা একজন আত্মবিশ্বাসী, যুক্তিনিষ্ঠ ও বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ হিসেবে দেখি, যে যুক্তির আলোয় সমাজকে দেখতে চায়।

(২) সমাজ-সংস্কারক ও আদর্শবাদী:

ধীরেন সমাজের উন্নতির জন্য কাজ করতে চেয়েছিল।
সে সাতজন যুবককে নিয়ে ‘তরুণ সমিতি’ গঠন করে এবং নিজের খরচে একটি লাইব্রেরি তৈরি করেছিল।
তার লক্ষ্য ছিল— গ্রামের অশিক্ষা, কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাস দূর করা এবং গ্রামীণ সমাজে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেওয়া।

(৩) দায়িত্বশীল ও মানবিক স্বভাব:

ধীরেন তার বোন শুভ্রাকে খুব ভালোবাসত। শুভ্রা অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় বাপের বাড়িতে এসে যাতে অসুবিধায় না পড়ে, সে জন্য ধীরেন বাড়ির পিছনের ডোবার ঘাটে তালগাছের ধাপ তৈরি করে দিয়েছিল।
এ থেকেই তার মানবিকতা ও কর্তব্যপরায়ণতা প্রকাশ পায়।

(৪) সংগ্রামী চরিত্র:

গল্পে ধীরেনকে আমরা দেখি দুটি শক্তির মাঝে সংগ্রাম করতে—
একদিকে তার নিজের বিজ্ঞানমনস্কতা ও যুক্তিবোধ,
অন্যদিকে গ্রামের অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কার।
বোনের রহস্যজনক মৃত্যুর পর গ্রামবাসীর গুজব, ভয় ও সন্দেহ তাকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে।

(৫) কুসংস্কারের কাছে পরাজিত:

গল্পের শেষে ধীরেনের মানসিক ভাঙন চরমে পৌঁছায়। সে নিজেই বিশ্বাস করতে শুরু করে ভূতপ্রেতের অস্তিত্বে।
অবশেষে, ওঝার কথায় তার ওপর বলাই চক্রবর্তীর প্রেতাত্মা ভর করেছে বলে প্রচার হয় এবং ধীরেন অচেতন অবস্থায় বলে ওঠে—
“আমি বলাই, আমিই শুভ্রাকে খুন করেছি।”
এভাবেই একজন শিক্ষিত ও যুক্তিবাদী মানুষ কুসংস্কারের কাছে সম্পূর্ণভাবে পরাজিত হয়।

মূল্যায়ন:

ধীরেন চরিত্রটি শিক্ষা ও কুসংস্কারের সংঘাতের প্রতীক।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এই চরিত্রের মাধ্যমে দেখিয়েছেন— সমাজের গভীরে প্রোথিত অন্ধবিশ্বাস কত সহজেই শিক্ষিত মানুষকেও দুর্বল করে দিতে পারে। ধীরেনের পতনের মধ্য দিয়ে লেখক যুক্তিবাদী চিন্তার করুণ পরিণতি ও সমাজবাস্তবতার নির্মম রূপ তুলে ধরেছেন।

Q.৯ “পঞ্চাশ টাকা রিওয়ার্ড ঘোষণা করেছি।” — কে, কী উদ্দেশ্যে রিওয়ার্ড ঘোষণা করেছিল? এই উক্তির আলোকে বক্তার চরিত্রের কোন বৈশিষ্ট্যটি ধরা পড়েছে তা আলোচনা করো।

উত্তর: প্রখ্যাত কথাশিল্পী মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘হলুদ পোড়া’ গল্পে এই উক্তিটি করেছে নবীন, বলাই চক্রবর্তীর ভাইপো। বলাইয়ের রহস্যজনক মৃত্যুর পর নবীন তার কাকার খুনিকে ধরিয়ে দিতে পঞ্চাশ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করে। উদ্দেশ্য ছিল—গ্রামবাসীর চোখে নিজেকে সৎ ও দুঃখিত মানুষ হিসেবে প্রমাণ করা এবং খুনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে নিজের প্রতি সন্দেহ দূর করা।

গল্পে নবীন চরিত্রের মাধ্যমে লেখক মানুষের লোভ, ভণ্ডামি ও স্বার্থপরতা উন্মোচন করেছেন। বলাইয়ের মৃত্যুর পর নবীন তার বিপুল সম্পত্তির মালিক হয়। সে শহরের সামান্য চাকরি ছেড়ে গ্রামে ফিরে আসে শুধুমাত্র সম্পত্তির লোভে। কিন্তু সেই লোভ যাতে কেউ বুঝতে না পারে, তাই সে কুমিরের কান্না কাঁদে এবং নাটকীয় ভঙ্গিতে পুরস্কার ঘোষণা করে।

তার চতুরতা ও কপটতা প্রকাশ পায় যখন সে চশমার কাঁচ মুছতে মুছতে আবেগপূর্ণ ভঙ্গিতে বলে—
“যারা একাজ করেছে, তাদের ফাঁসিতে ঝুলিয়ে তবেই নিশ্বাস নেব।”
এভাবেই সে নিজের ভণ্ড আবেগের মাধ্যমে গ্রামের মানুষকে ভুল পথে চালিত করে।

Q.১০ “দামিনীর দাঁতে দাঁত লেগে গেল” — দামিনীর পরিচয় দিয়ে বিষয়টি আলোচনা করো।

উত্তর: বিখ্যাত কথাসাহিত্যিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘হলুদ পোড়া’ গল্পে দামিনী ছিল বলাই চক্রবর্তীর ভাইপো নবীন চক্রবর্তীর স্ত্রী। শহরে বসবাসকারী নবীন কাকার মৃত্যুর পর সম্পত্তির লোভে স্ত্রীকে নিয়ে গ্রামে ফিরে আসে। গ্রামের মানুষ তখনও বলাই ও শুভ্রার রহস্যময় মৃত্যুর আলোচনা নিয়ে উদ্বিগ্ন। ঠিক এই সময় দামিনীর ওপর ঘটে এক আশ্চর্য ঘটনা।

এক সন্ধ্যায় রান্নাঘর থেকে শোবার ঘরে যাওয়ার পথে হঠাৎ এক দমকা হাওয়ায় দামিনীর হাতে ধরা লণ্ঠন নিভে যায়। মুহূর্তের মধ্যেই সে ভারসাম্য হারিয়ে উঠোনে পড়ে জ্ঞান হারায়। এরপর তার শরীর কাঁপতে থাকে, দাঁতে দাঁত লেগে যায়, এবং মুখ দিয়ে ভেসে আসে এক অস্বাভাবিক আওয়াজ—যেন অন্য কেউ কথা বলছে তার মুখ দিয়ে।

গ্রামের ওঝা কুঞ্জ এসে জানায়, দামিনীর ওপর শুভ্রার প্রেতাত্মা ভর করেছে। দামিনীর মুখ দিয়েই বেরিয়ে আসে ভয়ঙ্কর স্বীকারোক্তি—
“আমাকে বলাই চক্রবর্তী খুন করেছে।”

এই ঘটনার পর থেকেই গল্পে কুসংস্কার, ভয় ও অন্ধবিশ্বাসের ছায়া আরও ঘন হয়ে ওঠে। দামিনীর ঘটনাই আসলে গল্পের রহস্যময়তার সূচনা এবং যুক্তিবাদী সমাজচেতনার ওপর অন্ধবিশ্বাসের প্রভাবের প্রতীক।

Q.১১ “আমি তো পাস করা ডাক্তার নই…” — মন্তব্যটির প্রসঙ্গ নির্দেশ করো। বক্তা সম্পর্কে কাহিনি থেকে যা জানা যায়, নিজের ভাষায় লেখো।

উত্তর:
প্রসঙ্গ: বিখ্যাত কথাসাহিত্যিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘হলুদ পোড়া’ গল্পে ধীরেন চাটুজ্যে গ্রামের স্কুলের ভূগোল শিক্ষক ও স্বশিক্ষিত ডাক্তার। একদিন নবীন চক্রবর্তীর স্ত্রী দামিনী হঠাৎ অসুস্থ হয়ে জ্ঞান হারায় এবং পরে অস্বাভাবিক আচরণ করতে শুরু করে—কখনও হাসে, কখনও কাঁদে, আবার কখনও মানুষকে আঁচড়ে কামড়ে দেয়।

এই অবস্থায় ধীরেন চিকিৎসার জন্য ডাকা হলে পরিস্থিতির ভয়াবহতা দেখে সে বুঝতে পারে যে, এটি সাধারণ অসুখ নয়। নিজের সীমাবদ্ধতা অনুধাবন করে সে বলে ওঠে—
“আমি তো পাস করা ডাক্তার নই…”
অর্থাৎ, সে নিজেকে এই জটিল অবস্থায় চিকিৎসা করার যোগ্য মনে করে না এবং পাশ করা ডাক্তার কৈলাশকে ডেকে আনার পরামর্শ দেয়।

বক্তার পরিচয় ও চরিত্র:

শিক্ষিত ও যুক্তিবাদী মানুষ:

ধীরেন পদার্থবিজ্ঞানে বি.এসসি পাশ করা একজন শিক্ষিত ও যুক্তিনিষ্ঠ ব্যক্তি।

সমাজসেবক ও সংস্কারক:

সে গ্রামের উন্নতির জন্য ‘তরুণ সমিতি’ গঠন করে এবং একটি পাঠাগার স্থাপন করেছিল।

স্বশিক্ষিত চিকিৎসক:

পেশাদার ডাক্তার না হয়েও বই পড়ে চিকিৎসাশাস্ত্র শিখেছিল এবং দরিদ্রদের বিনামূল্যে চিকিৎসা করত।

সততা ও দায়িত্ববোধ:

দামিনীর চিকিৎসার সময় দায়িত্ব থেকে পিছু না হটে, অভিজ্ঞ ডাক্তার ডাকার পরামর্শ দেয়—যা তার সততা ও আত্মজ্ঞান প্রকাশ করে।

Q.১২ “তারা প্রায় সকলেই বুড়ো ঘোষালের কথায় সায় দিল।” — বুড়ো ঘোষাল কে ছিলেন? তার কথার যে নানারকম প্রতিক্রিয়া হয়েছিল, নিজের ভাষায় লেখো।

উত্তর: বিখ্যাত কথাসাহিত্যিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘হলুদ পোড়া’ গল্পে বুড়ো ঘোষাল বলতে গ্রামের প্রবীণ ও প্রভাবশালী ব্যক্তি পঙ্কজ ঘোষালকে বোঝানো হয়েছে।

প্রতিক্রিয়া:

জনসমর্থন:

দামিনীর অস্বাভাবিক অসুস্থতা দেখে যখন সবাই বিভ্রান্ত, তখন পঙ্কজ ঘোষাল পরামর্শ দেয়—এ রকম “খাপছাড়া অসুখে” ডাক্তার নয়, গুনিনের চিকিৎসাই কার্যকর। তার কথায় গ্রামের প্রায় সকলেই সায় দেয় এবং নবীনকে কুঞ্জ গুনিনকে ডেকে আনার অনুরোধ জানায়।

ধীরেনের বিরোধিতা:

পঙ্কজ ঘোষালের কথার তীব্র প্রতিবাদ করে ধীরেন। সে যুক্তিবাদী মানুষ; তাই বলে—একজন শিক্ষিত মানুষের কুসংস্কারে ভরসা না রেখে ডাক্তার ডাকা উচিত।

নবীনের অবস্থান:

নবীন ধীরেনের বন্ধু হলেও ঘোষালের কথায় প্রভাবিত হয়। তার মতে, কিছু কিছু অস্বাভাবিক অসুখে গুনিনদের চিকিৎসায় উপকার মেলে। তবে ধীরেনের পরামর্শকেও অগ্রাহ্য না করে, শেষ পর্যন্ত সে ডাক্তার ও গুনিন—দুজনকেই ডেকে আনার সিদ্ধান্ত নেয়।

Q.১৩ “কুঞ্জ মাঝির সাথে তো চালাকি চলবে না।” — কোন প্রসঙ্গে বক্তা এ কথা বলেছে?
নিজের বক্তব্যের সমর্থনে কুঞ্জ যা যা করেছিল, তার বর্ণনা দাও।

উত্তর: বিখ্যাত কথাসাহিত্যিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘হলুদ পোড়া’ গল্পে এই উক্তিটি করেছে কুঞ্জ গুনিন নিজেই।

প্রসঙ্গ: নবীনের স্ত্রী দামিনীর ওপর অশরীরী আত্মা ভর করেছে বলে ধারণা করা হলে, গ্রামের প্রবীণদের পরামর্শে কুঞ্জ গুনিনকে ডাকা হয়। দামিনীর অস্বাভাবিক আচরণ ও উপস্থিত জনতার কৌতূহল দেখে কুঞ্জ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ঘোষণা করে—

“কুঞ্জ মাঝির সঙ্গে তো চালাকি চলবে না।”

এর মাধ্যমে সে বোঝায় যে কোনো আত্মা বা প্রেতাত্মা তার কাছ থেকে পালাতে পারবে না; সে অবশ্যই ভূত তাড়াতে সক্ষম।

কুঞ্জের কার্যকলাপ:

মঞ্চ তৈরি:

কুঞ্জ প্রথমে সবাইকে দাওয়ার ওপর থেকে উঠোনে সরিয়ে দেয়। তারপর মন্ত্র পড়ে দাওয়ায় জল ছিটায় এবং দামিনীর এলোমেলো চুল শক্ত করে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে দেয়।

মন্ত্রপাঠ ও ধোঁয়া সৃষ্টি:

সে চারদিকে ঘুরে ঘুরে দুর্বোধ্য মন্ত্র পড়তে থাকে। একটি মালসায় আগুন ধরিয়ে শুকনো পাতা ও শিকড় পোড়ায়, ফলে চারপাশে চামড়ার মতো উৎকট গন্ধে ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে।

হলুদ পোড়া:

কিছুক্ষণ পরে যখন দামিনী নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে, তখন কুঞ্জ একটি কাঁচা হলুদ আগুনে পুড়িয়ে তার নাকের কাছে ধরে। পোড়া হলুদের গন্ধে দামিনীর চোখ বড়ো বড়ো হয়ে যায়, আর তার মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসে—

“আমি শুভ্রা গো, শুভ্রা… বলাই বুড়ো আমায় খুন করেছে।”

এইভাবে কুঞ্জ তার অলৌকিক ক্ষমতার প্রদর্শন করে উপস্থিত জনতার সামনে প্রমাণ করে যে, তার সঙ্গে সত্যিই “চালাকি চলবে না।”

Q.১৪ ‘হলুদ পোড়া’ গল্পে লেখক যে ভৌতিক পরিবেশ সৃষ্টি করেছেন, তা তোমার নিজের ভাষায় লেখো।

উত্তর: বিখ্যাত কথাসাহিত্যিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ‘হলুদ পোড়া’ গল্পে আবহমান বাংলার গ্রামীণ জীবনের কুসংস্কার, ভয় ও অলৌকিকতার মিশ্রণে এক গা-ছমছমে ভৌতিক পরিবেশ সৃষ্টি করেছেন।

গ্রাম্য কুসংস্কার:

গল্পে দেখা যায়, গ্রামীণ সমাজে কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাসের প্রভাব গভীর। মানুষ বাস্তবতার বদলে কল্পনাকেই সত্য বলে মেনে নেয়। লেখক এই মানসিকতার মধ্যেই অলৌকিকতার পরত বসিয়ে গল্পের ভৌতিক আবহকে শক্তিশালী করেছেন।

ভৌতিক পরিবেশের সৃষ্টি:

গল্পের শুরুতেই একের পর এক দুটি খুন—বলাই চক্রবর্তী ও শুভ্রার মৃত্যু—গ্রামের শান্ত পরিবেশে ভয়ের সঞ্চার করে। এরপর নবীনের স্ত্রী দামিনীর ওপর প্রেতভর, কুঞ্জ গুনিনের তান্ত্রিক কেরামতি, ক্ষেন্তি পিসির পোড়া বাঁশের বিধান, এবং ধীরেনের পরিবারে ভূতের আতঙ্ক—এসব একে একে গল্পের পরিবেশকে অশুভ, অন্ধকার ও রহস্যময় করে তোলে।

শেষদিকে যখন যুক্তিবাদী ধীরেন নিজেই বোনের আত্মার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে, তখন পাঠকের মনেও এক গভীর ভয় ও ভৌতিকতার অনুভূতি তৈরি হয়।

মূল্যায়ন:

‘হলুদ পোড়া’ গল্পে লেখক দেখিয়েছেন, যুক্তিবাদী মনও কুসংস্কারের আবেশে গ্রাসিত হতে পারে। গল্পের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যে ভৌতিক আবহ বিরাজ করেছে, তা পাঠকের মনে ভয়, কৌতূহল ও বিস্ময়ের এক অমোঘ প্রভাব ফেলে।

হলুদ পোড়া (মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়) গল্পের ২ মার্কের প্রশ্ন উত্তর

প্রশ্ন ১: ‘হলুদ পোড়া’ গল্পে দামিনীর উপর কার ভর হয়েছিল বলে মনে করা হয়?

উত্তর: গল্পে দামিনীর উপর প্রেতিনীর ভর হয়েছিল বলে মনে করা হয়। দামিনী প্রথমে শুভ্রা নামে এক মৃত মেয়ের নাম করে, পরে খুনি হিসেবে বলাই খুড়োর নাম বলে।

প্রশ্ন ২: ‘হলুদ পোড়া’ গল্পে বলাই খুড়ো কে? দামিনীর মুখে তার নাম কেন উঠে এসেছিল?

উত্তর: বলাই চক্রবর্তী বা বলাই খুড়ো গ্রামের এক চরিত্র। দামিনীর মুখে তার নাম উঠে আসার তাৎপর্য হলো—গল্পটি কেবল কুসংস্কারের ভয় নয়, বরং এর আড়ালে বাস্তব কোনো অপরাধ লুকিয়ে আছে কিনা, সেই ইঙ্গিত দেওয়া।

প্রশ্ন ৩: “বছর দেড়েক মেয়েটা শ্বশুরবাড়ি ছিল, গাঁয়ের লোকের চোখের আড়ালে।” — এখানে ‘মেয়েটা’ কে?

উত্তর: এখানে ‘মেয়েটা’ হলো মৃত শুভ্রা। সে শ্বশুরবাড়িতে থাকাকালীনই রহস্যজনকভাবে মারা যায়, যার পেছনে অশুভ প্রভাব বা অপরাধের ইঙ্গিত রয়েছে।

প্রশ্ন ৪: “নবীনের সাহসও প্রায় মরিয়া হইয়া উঠিয়াছে।” — নবীনের এই মরিয়া হয়ে ওঠার কারণ কী?

উত্তর: নবীনের স্ত্রী দামিনী প্রেতিনীর ভরে অস্থির হয়ে উঠেছিল। স্ত্রীকে বাঁচানোর উপায় না দেখে ও গ্রামবাসীর আতঙ্কে নবীন চরম অসহায় অবস্থায় মরিয়া হয়ে উঠেছিল।

প্রশ্ন ৫: ‘হলুদ পোড়া’ গল্পটির নামকরণের সার্থকতা আলোচনা করো।

উত্তর: গল্পটির নাম বিষয়বস্তুর সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। প্রেতিনীর ভর কাটানোর সময় ওঝা দামিনীর নাকের সামনে কাঁচা হলুদ পুড়িয়ে ধোঁয়া দেয়—এই ‘হলুদ পোড়া’ ক্রিয়াই গল্পের মূল ঘটনাকে প্রতীকীভাবে ধারণ করে। তাই নামকরণটি সম্পূর্ণ সার্থক।

প্রশ্ন ৬: দামিনীর ‘ভর’ কাটানোর জন্য কী করা হয়েছিল?

উত্তর: দামিনীর ‘ভর’ কাটাতে ওঝা কুঞ্জকে ডাকা হয়। সে দামিনীর চুল খুঁটির সঙ্গে বেঁধে দেয়, মন্ত্র পড়ে, আগুনে শুকনো পাতা ও শিকড় পোড়ায়, এবং শেষে নাকে হলুদ পোড়ার ধোঁয়া দেয়।

প্রশ্ন ৭: “যদি ছোঁয়াচ লাগে, নজর লাগে, অপরাধ হয়!” — কাদের সম্পর্কে এমন কথা বলা হয়েছিল?

উত্তর: এই কথাগুলি গ্রাম্যের কমবয়সী মেয়েদের সম্পর্কে বলা হয়েছিল। মানুষজন ভাবত, প্রেতিনীর ভর দেখতে গেলে তাদেরও অশুভ ছোঁয়াচ বা নজর লেগে যেতে পারে।

প্রশ্ন ৮: মানুষ মন্ত্রমুগ্ধের মতো দাওয়ার দিকে তাকিয়ে ছিল কেন?

উত্তর: প্রেতিনীর ভর ও ঝাড়ফুঁক গ্রামীণ মানুষের কাছে ছিল এক দুর্লভ রোমাঞ্চের বিষয়। ওঝা কুঞ্জের কেরামতি এবং অশুভ শক্তিকে বশ করার দৃশ্য দেখতেই তারা মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে ছিল।

প্রশ্ন ৯: ‘হলুদ পোড়া’ গল্পে কোন কোন খুনের ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়?

উত্তর: গল্পে দুটি খুনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়—প্রথমটি মৃত শুভ্রার খুন, এবং দ্বিতীয়টি দামিনীর। দামিনী প্রেতিনীর ভরে বলাই খুড়োর নাম বলায় গল্পে রহস্যের জন্ম নেয়।

প্রশ্ন ১০: “দুটো খুনের মধ্যে কি কোনো যোগাযোগ আছে?” — লেখকের মনে এই প্রশ্ন জাগার কারণ কী?

উত্তর: লেখক দেখেন, বহুদিন পর গ্রামে দুটো খুন ঘটেছে এবং দুটো ক্ষেত্রেই বলাই খুড়োর নাম উঠে এসেছে। এই মিল থেকেই লেখকের মনে যোগাযোগ থাকার প্রশ্ন জেগে ওঠে।

আরও দেখো:

HS English 4th Semester Hawk Roosting Bengali Meaning

Leave a Comment

CLOSE